নূন্যতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ ও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের কারণে সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন সোমবারে সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের অন্তত ৬৮১টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্ধ ও স্থবির হয়ে পড়া এই ৬৮১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৭৯টিই তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী কারখানা (আরএমজি)। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, কেবল এক দিনের ব্যবধানেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কারখানার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে; যেখানে রবিবার ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছিল, সেখানে সোমবারে তা পৌনে সাতশ ছাঁড়িয়ে যায়।
বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সোমবারে কাজ বন্ধ রেখে বেরিয়ে যান বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্প এলাকার কারখানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে নিচের অঞ্চলগুলোতে:
- গাজীপুর অঞ্চল: গাজীপুর ও এর আশপাশের অন্তত ৩৮২টি পোশাক কারখানায় কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
- মিরপুর অঞ্চল: রাজধানীর মিরপুর এলাকার ৬৫টি কারখানায় উৎপাদন স্তব্ধ ছিল।
- সাভার, আশুলিয়া ও জিরানি: এসব এলাকার ৯টি বড় কারখানায় অচলাবস্থা তৈরি হয়।
সংগঠনটির তথ্যমতে, এই কারখানাগুলোতে সম্মিলিতভাবে ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৭৮২ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ আন্দোলনে অংশ নেন বা নিরাপত্তার অভাবে কাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
গার্মেন্টস খাতের পাশাপাশি আন্দোলনের আঁচ পড়েছে অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পেও। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত একটি বড় দেশীয় জুতার কারখানায় সকালে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হলেও আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকে। সকাল ৯টার দিকে বাইরে থেকে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের চাপ ও বিশৃঙ্খলার মুখে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কারখানাটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। একইভাবে আশুলিয়ায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘পিকার্ড বাংলাদেশ’-এর উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
গত সপ্তাহ থেকেই পোশাক খাতের শ্রমিকরা সাভার, গাজীপুরসহ অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে বেতন স্কেল বাড়ানোর দাবিতে রাজপথে নামেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রবিবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পোশাকশ্রমিকদের জন্য একটি নতুন ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ গঠন করা হয়।
তবে সরকারি স্তরে এই পদক্ষেপ সত্ত্বেও মাঠে শ্রমিকদের অসন্তোষ প্রশমিত হয়নি। সোমবারেও গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ ও মিছিল প্রদর্শন করেন। কিছু কিছু স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে।
এলাকার এই নাজুক আইন-শৃঙ্খলা ও উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সোমবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কার্যালয়ে তৈরি পোশাক খাতের মালিকপক্ষের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী ধাপে বিকেলেও সরকারের মধ্যস্থতা অব্যাহত থাকে। বিকেলবেলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী যৌথভাবে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। এতে আন্দোলন থামিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কারখানায় ফিরে আসার জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি জানান, উদ্যোক্তাদের কখনোই কারখানা বন্ধ রাখার কোনো ইচ্ছা নেই, কারণ কারখানা বন্ধ থাকলে মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিবেশের কারণে স্বাভাবিক উপায়ে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, মঙ্গলবারও মালিকপক্ষ কারখানা খোলা রেখে কাজ চালিয়ে নেওয়ার সব ধরনের চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক উন্নতি না হয়, তবে শ্রমিক ও সম্পদের সুরক্ষায় কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তবে শ্রমিকনেতা, প্রশাসন ও মালিকপক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
