জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের জন্য বাড়তি তিন বছর সময়সীমা মঞ্জুর করায় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে নতুন সময় নির্ধারিত হয়েছে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর। তবে সরকার এই বর্ধিত সময়কে কেবল অতিরিক্ত মেয়াদ হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।
রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের এই সুদূরপ্রসারী সংস্কার পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রস্তুতির এই ৩ বছর সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ উন্মোচন এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এলডিসি উত্তোরণের পরিবর্তিত সময়ের সঠিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সরকার মূলত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর ভিত্তি করে তাদের সংস্কার কার্যক্রম চালনা করবে:
১. ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও টেকসই অর্থায়ন: দেশের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান উৎস ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা। এই খাতে স্বাভাবিক গতি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে। ২. শিল্প ও উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা: শিল্প উৎপাদন সচল রাখা ও টেকসই শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ৩. বৈশ্বিক চাহিদানুযায়ী নতুন রপ্তানিপণ্য: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে প্রথাগত পণ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী নতুন ও বহুমুখী পণ্যের তালিকা প্রস্তুতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ৪. নতুন বাজার অনুসন্ধান: বাণিজ্যের পরিধি ও পরিধি বিস্তৃত করতে ঐতিহ্যগত বাজারের বাইরে নতুন নতুন বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া। ৫. মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন: এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা কমে যাওয়ায় যে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, তা সামাল দিতে বিভিন্ন দেশের সাথে এফটিএ বা সেপা (CEPA) চুক্তি সম্পন্ন করা।
অর্থ উপদেষ্টা ব্যাংকিং ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের ওপর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের কারণে সময় বাড়ানোর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন। প্রধান তিনটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ হলো:
- উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতি: পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা কাটিয়ে ওঠা।
- বাহ্যিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বৈরী পরিবেশ: মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক-রাজনৈতিক সংকট এবং বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্য সময় প্রয়োজন।
- পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি: এসব বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে পূর্ববর্তী পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব ছিল, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।
তবে সরকার স্পষ্ট করেছে যে, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে এবং কোনোভাবেই এই প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে না দেখে রূপান্তরের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।
সরকারের এই বড় মাপের সংস্কার পরিকল্পনায় বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
উপদেষ্টা তিতুমীর নিশ্চিত করেন যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)—সবকটি সংস্থাই সরকারের কৌশলগত উন্নয়ন প্রচেষ্টায় পাশে রয়েছে। বিশেষ করে আইএমএফের চলমান কর্মসূচির সাথে সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতিগত সংস্কারগুলোর চমৎকার সমন্বয় রয়েছে।
এবারের সংস্কার কার্যক্রমে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে যা বিগত দিনের যেকোনো উদ্যোগের চেয়ে ব্যতিক্রম। এটিকে সর্বসম্মত ও অংশীদারত্বভিত্তিক একটি উদ্যোগ হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রধান পাঁচটি পক্ষ যুক্ত রয়েছে:
- বাংলাদেশের জনগণ (যাদের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেটের ওপর ভিত্তি করে এই পরিকল্পনা পরিচালিত হচ্ছে)
- দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি খাত
- জাতিসংঘ
- উন্নয়ন সহযোগী দেশসমূহ
- বহুপক্ষীয় আর্থিক ও উন্নয়ন সংস্থা
সরকারের মতে, জনগণকে সম্পৃক্ত করে জনম্যান্ডেটের ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত এই সর্বসম্মত অংশীদারত্ব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা তৈরি করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া সরকার বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের প্রতি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলডিসি বৈঠকে যুক্ত রাখছে। তাদের সাথে কার্যকর সমঝোতা বা ‘কম্প্যাক্ট’ গড়ে তুলে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার, যা মূলতঃ ‘থ্রি আর’ (3R) কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
টেকসই শিল্পায়নের স্বার্থে সরকার দেশের জ্বালানি খাতকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কৌশলগত অবস্থান হিসেবে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হচ্ছে জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামো। পাশাপাশি আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকাতেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- এলএনজি সক্ষমতা অর্জন: এলএনজি আমদানির সুযোগ সহজ করতে শুধু ভাসমান টার্মিনালই নয়, বরং স্থায়ী স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। একই সাথে এলএনজি আমদানির উৎস কেবল দু-একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমুখী করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
- নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও অপচয় রোধ: গ্রিন এনার্জি বা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি করা এবং জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনাকাঙ্ক্ষিত অপচয় বা ‘সিস্টেম লস’ কমানোর কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এলডিসি থেকে সফল উত্তরণের পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বর্তমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা থাকবে না। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে।
এই সম্ভাব্য বাণিজ্য ঝুঁকি হ্রাস করতে সরকার ইতোমধ্যে নতুন রপ্তানি বাজার এবং নতুন পণ্যের চাহিদা নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে। একই সাথে বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত গতিতে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কিংবা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) সম্পাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।
