মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, বীমা প্রিমিয়াম ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একই সঙ্গে দাম বাড়ানোর কারণে জনগণের যে কষ্ট হবে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।
গতকাল সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বীমার প্রিমিয়াম ও জাহাজভাড়া বাড়ছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমরা বারবারই বলেছিলাম, উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না। এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে বলে সরকার আশা করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে কিংবা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পরও ডিজেলে প্রতি লিটারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করায় বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে লোকসান হয়েছে তিন হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। মূল্য সমন্বয় না করলে এক বছরেই শুধু ডিজেলে সরকারের লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে তা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াত।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ক্যাবের প্রতিক্রিয়া : জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অপরিণামদর্শী ও সুবিবেচনাপ্রসূত নয় বলে মন্তব্য করেছেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে রবিবার রাত ১০টার দিকে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব বিষয়ই আন্তঃসম্পর্কিত।
নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাসাবাড়িসহ সব জায়গায়ই খরচ বাড়বে। গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়বে। এসব খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত বাড়তি টাকাটা ভোক্তার পকেট থেকেই যাবে। এতে মানুষের খরচের পাল্লা ভারী হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য পণ্য ও সেবার সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও আরেক দফা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, এর আগে ব্যবসায়ীরা ইরান সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ার কারণ দেখিয়েও তাঁরা বিভিন্ন সময়ে দাম বাড়িয়েছেন। এবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তাঁরা আরেক দফা দাম বাড়াবেন। এরই মধ্যে চিনি, সয়াবিন তেল, ময়দা, আটা, গরুর দুধসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন এসব পণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নাজের হোসাইন আরো বলেন, সরকার নবম পে স্কেল ঘোষণা করেছে। এই পে স্কেল ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরেক দফা বেড়েছে এবং এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ ব্যয় করতে হচ্ছে। ১৮ কোটি বা ২০ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করে সরকার সিদ্ধান্তগুলো নিলে সেটি সবার জন্য ভালো হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বিপিসি দাম সমন্বয় করবে, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দাম কমানোও উচিত। কিন্তু বিপিসির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা তাঁরা দেখেননি।
