হরমুজ প্রণালিতে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ডুবল ২ বাণিজ্যিক জাহাজ

আন্তর্জাতিক স্লাইড

মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক অবনতির দিকে মোড় নিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে অঞ্চলটিতে দুটি আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে গেছে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা বুধবার এক যৌথ বার্তায় নিশ্চিত করেছে যে, ডুবে যাওয়া জাহাজ দুটির একটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেইনারবাহী যান এবং অপরটি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার। সংঘাতময় এই প্রণালীতে মার্কিন-ইরান সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে এই বড় ধাক্কা এলো।

সংঘাতের পটভূমি: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি অবস্থান

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইরান সামরিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি সামুদ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরও তীব্র হয়েছে।

গত মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামুদ্রিক বন্দরগুলোর ওপর সর্বাত্মক অবরোধ ঘোষণা করে এবং একের পর এক নতুন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান সরকার সতর্ক বার্তা জারি করে জানায়, হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সামরিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতার ওপর তারা কঠোর নজরদারি ও পাল্টা আক্রমণ জোরদার করবে। গত দশ দিনে এই জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো এই দুই জাহাজডুবি।

দুটি ভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি মর্মান্তিক ঘটনা নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয় ১ম ঘটনা: ‘জিএফএস প্রাইড’ ২য় ঘটনা: ‘কেপ দাও’
জাহাজের ধরন কনটেইনার জাহাজ (২,৮২৪ টিইইউ) ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ার
পতাকা (নিবন্ধন) সিঙ্গাপুর অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা
হামলার সময় মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) ২৩ সেপ্টেম্বর (ডুবে যায় বুধবারে)
হামলার ধরন বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত
ক্ষতি ও প্রাণহানি জাঁহাজ ডুবে গেছে; ২১ জন নাবিকের সবাই জীবিত উদ্ধার। জাহাজ ডুবে গেছে; সেপ্টেম্বরের হামলায় ১ জন নাবিক নিহত হন।
পরিচালনাকারী সংস্থা সিঙ্গাপুর মেরিটাইম অথরিটি নিশ্চিত করেছে পিওনিস শিপম্যানেজমেন্ট (সংযুক্ত আরব আমিরাত)

সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি (এমপিএ) জানিয়েছে, মঙ্গলবার প্রজেক্টাইল হামলায় অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর কন্টেইনার জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’ রক্ষায় চেষ্টা করা হলেও তা সাগরে তলিয়ে যায়। তবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় এর ২১ জন সদস্যের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক পিওনিস শিপম্যানেজমেন্ট পরিচালিত ‘কেপ দাও’ জাহাজটি গত সেপ্টেম্বরে হামলার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ছিল এবং বুধবারে তা পুরোপুরি ডুবে যায়।

হরমুজ প্রণালির ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি

গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত মোট তিনটি বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে ধ্বংস ও নিমজ্জিত হলো:

১. সাফিন প্রিস্টিজ (মার্চ): প্রজেক্টাইল হামলায় ডুবে যাওয়া মাল্টার পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ।

২. এমএসসি ফ্রান্সেসকা (এপ্রিল): ইরানের রিভোল্যুশনারি গার্ড কর্তৃক আটককৃত জাহাজ।

৩. জিএফএস প্রাইড ও কেপ দাও (অক্টোবর): সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ধ্বংস হওয়া দুটি জাহাজ।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের মোট পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের যাতায়াত পথ। যেভাবে সেখানে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে অগ্নিকাণ্ড ও নিমজ্জনের ঘটনা ঘটছে, তাতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এই রুট ব্যবহারে চরম অনীহা প্রকাশ করছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Supply Chain) এক অভূতপূর্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *