সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফ্লাইদুবাইয়ের এক সহকারী পাইলটের বিরুদ্ধে যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ইসরায়েলের তেল আবিব বিমানবন্দরের টার্মিনালে আছড়ে ফেলার আত্মঘাতী পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। এতে যত বেশি সম্ভব মানুষের প্রাণহানি ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল বলে জানিয়েছে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর।
শুক্রবার ইউএইর রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়ামকে (ডব্লিউএএম) এ তথ্য জানান দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল কাউন্সেলর ড. হামাদ সাইফ আল শামসি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি ওমানের নাগরিক। তার বয়স ২৯ বছর। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই নিউজ জানায়, তদন্তকারীদের দাবি, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফ২১০৭৩ ফ্লাইটে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন তিনি।
ওয়ামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তে ওই ব্যক্তির উগ্রপন্থী চিন্তাভাবনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার সময় তার মধ্যে এ ধরনের চিন্তার লক্ষণ দেখা যায়। সে সময় তিনি এমন কিছু লেখা ও অনলাইন কনটেন্ট পড়তেন, যেখানে সন্ত্রাসী সংগঠন ও আত্মঘাতী হামলার প্রশংসা করা হতো।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, পরে ওই ব্যক্তি সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের পক্ষে বিভিন্ন ধারণায় প্রভাবিত হন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে চালানো হামলাও তাকে প্রভাবিত করে। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, একই ধরনের হামলা চালাতে বিমান ব্যবহারের চিন্তা তার মাথায় আসে। এ উদ্দেশ্য থেকেই তিনি পাইলট হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।
আল শামসি জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ওমান এয়ারে কাজ করেন। এরপর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে যোগ দেন রয়্যাল এয়ার মারকে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন।
তদন্তকারীদের দাবি, এই হামলার আগে তিনি দুবার তেল আবিবগামী ফ্লাইটে যাতায়াত করেন। ওই রুট ও বিমানবন্দর সম্পর্কে ধারণা নিতেই তিনি এমনটি করেছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর তৃতীয়বারের মতো ওই রুটে যাওয়ার সময় তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
ওয়ামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে পড়াশোনার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিয়মিত রয়্যাল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (আরএমআইটি) সঙ্গে যুক্ত একটি মসজিদে যেতেন। সেখানে ‘মাই সেন্টার’ নামে পরিচিত একটি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
তার দাবি, ‘আবু হামজা’ নামে পরিচিত লেবাননের এক ব্যক্তি কেন্দ্রটি পরিচালনা করতেন। কেন্দ্রটি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠনের সহায়তা পেত বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এসব তথ্যও তদন্ত করে দেখছেন কর্মকর্তারা। তদন্তে আরো উঠে এসেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি হামলার জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তিনি সন্ত্রাসবাদের পক্ষে প্রচার চালানো বিভিন্ন লেখা ও অনলাইন কনটেন্ট পড়তেন। পাশাপাশি একজন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষকের কাছে মুষ্টিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতেন।
ফ্লাইদুবাইয়ে তার নিয়োগপ্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা। ওয়ামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি পেশাগত যোগ্যতা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করেছিলেন। তার পাইলটের লাইসেন্স ছিল। তিনি ভালো আচরণের সনদ জমা দিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় যাচাইও সম্পন্ন করেছিলেন। তবে এসব যাচাইয়ে তার উগ্রপন্থী চিন্তা বা হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, ঘটনার দিন বিমানের ককপিটের ভেতরে ক্যাপ্টেনের ওপর অতর্কিত হামলা চালান অভিযুক্ত সহকারী পাইলট। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের কুঠার দিয়ে তিনি ক্যাপ্টেনকে আঘাত করেন। এ সময় ক্যাপ্টেন বাধা দেন এবং সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করেন।
বিমানে ফিরতি ফ্লাইটের দায়িত্বে থাকা আরেকজন পাইলটও ছিলেন। ককপিটের দরজা অস্বাভাবিকভাবে বারবার খোলা ও বন্ধ হতে দেখে তিনি সেখানে যান। প্রবেশের সংকেত ব্যবহার করে ককপিটে ঢুকে তিনি হামলার ঘটনা দেখতে পান। পরে ওই পাইলট, একজন কেবিনকর্মী ও কয়েকজন যাত্রী মিলে হামলা থামানোর চেষ্টা করেন। তারা আহত ক্যাপ্টেনকে উদ্ধার করেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করেন।
এরপর ফিরতি ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন ও তার সহকারী পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। তারা বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, আইনজীবীর উপস্থিতিতে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিস্তারিত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এতে তিনি নিজের উদ্দেশ্য এবং হামলার পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ তুলে ধরেছেন। তিনি একাই এ কাজ করেছেন বলেও দাবি করেছেন।
তবে তার এই দাবি যাচাই করে দেখছেন তদন্তকারীরা। পরিকল্পনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, কিংবা অন্য কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় বিমানের ক্যাপ্টেন, ফিরতি ফ্লাইটের পাইলট, তার সহকারী পাইলট এবং অন্য কর্মীদের বক্তব্য নিয়েছে সরকারি প্রসিকিউটারের দপ্তর।
ফরেনসিক চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানের ক্যাপ্টেনের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আঘাতের ধরন জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহৃত কুঠারের মতো কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের সঙ্গে মিলে যায়। আঘাতের সময়ও ঘটনার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়ামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি প্রসিকিউটারের দপ্তর এখনো বিভিন্ন প্রমাণ পরীক্ষা করছে। এর মধ্যে ঘটনার রেকর্ডিং ও কারিগরি প্রতিবেদন রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী, উপযুক্ত সময়ে আরো তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
