বকেয়া রাজস্ব উদ্ধারে এনবিআরের বড় উদ্যোগ, আদায়ে নেই সাড়া

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব আদায়ে একের পর এক বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠে তার ইতিবাচক বা আশানুরূপ কোনো সাড়া মিলছে না। একদিকে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতির মতো সহজ উপায়ে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা, অন্যদিকে বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সাথে শীর্ষপর্যায়ের বৈঠক এবং উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা দীর্ঘদিনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ—কোনো পদক্ষেপেই কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। আইনি পেঁচাল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক আর্থিক চাপের কারণে রাজস্ব আদায়ে দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। ফলে এনবিআরের এই সমস্ত বিস্তৃত পরিকল্পনা ও তৎপরতা মূলত কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে অর্জিত মোট আদায়ের তুলনায় এই নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি, যা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এত বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার বড় ঝুঁকিতে পড়ে সরকার শেষ পর্যন্ত আদালতে আটকে থাকা বিরাট অঙ্কের বকেয়া কর আদায় ও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা কর বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা জটিলতায় কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়েছে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, এনবিআরের আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস বা শুল্কসংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ মামলা বিভিন্ন আইনি ফোরামে ঝুলে রয়েছে। বর্তমানে আয়কর ও ভ্যাট ট্রাইব্যুনাল থেকে শুরু করে দেশের উচ্চ আদালত পর্যন্ত মোট ২৯ হাজার ৫১৯টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় এনবিআরের আটকে থাকা বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। খাতভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়:

  • আয়কর খাত: ৫ হাজার ৫০০টি মামলায় আটকে আছে প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল ১৬টি বড় আয়কর মামলাতেই জড়িত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থ।
  • ভ্যাট খাত: ১১ হাজার ৬৮৪টি মামলায় ঝুলে আছে প্রায় ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ভ্যাট সংক্রান্ত মামলাগুলোর সিংহভাগই উচ্চ আদালতে আটকে আছে, যার পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
  • শুল্ক খাত: ১২ হাজার ৩৩৫টি মামলায় আটকে আছে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।

আইনি প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে এবং আটকে থাকা টাকা উদ্ধারে এনবিআরের তিনটি প্রধান বিভাগ হতে প্রায় ৫০টি বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের একটি বিশেষ তালিকা প্রণয়ন করে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই নির্দিষ্ট ৫০টি প্রতিষ্ঠানের কাছেই এনবিআরের পাওনা রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা আটকে থাকা মোট রাজস্বের অর্ধেকেরও বেশি। অর্থমন্ত্রী নিজেই বকেয়া আদায়ের স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ মালিকপক্ষের সাথে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নেন এবং কয়েক দফায় বৈঠকের আহ্বান জানান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখন পর্যন্ত শুধু মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রতিনিধিরা ছাড়া আর কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিনিধি এসব বৈঠকে অংশ নেননি। ব্যবসায়ীদের এই অনীহা সরকারের বকেয়া উদ্ধারের প্রচেষ্টাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

বকেয়া আদায়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বা এডিআর (Alternative Dispute Resolution) পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও করদাতার সমঝোতার ভিত্তিতে দ্রুত পাওনা আদায় নিশ্চিত করাই ছিল এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য। এমনকি এ লক্ষ্য সামনে রেখে গত বাজেটে প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনও আনা হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস পার হয়ে গেলেও এডিআর প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য (করনীতি) সৈয়দ আমিনুল করিমের মতামত হলো, এডিআর পদ্ধতির সফলতা মূলত নির্ভর করে উভয় পক্ষের পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতার ওপর। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে রাজস্ব কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী—কোনো পক্ষই ছাড় দিতে সম্মত হন না। তদুপরি, এডিআর আইনে এখনও বেশ কিছু আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়ে গেছে, যার সময়োপযোগী সংস্কার জরুরি।

এমতাবস্থায় মামলাভিত্তিক জট খুলতে এনবিআর বিকল্প আইনি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের চিন্তা করছে। বকেয়া রাজস্ব উদ্ধারে আগামী দিনগুলোতে যেসব কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে: ১. আইনি অগ্রাধিকার: রাজস্বসংক্রান্ত বড় মামলাগুলো দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে উচ্চ আদালতের কার্যতালিকায় তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জোর প্রচেষ্টা। ২. হিসাব সমন্বয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: বকেয়াদারদের হিসাব সমন্বয় করা, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা এবং সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ। ৩. দীর্ঘদিনের নিরীক্ষা জট নিরসন: এনবিআরের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে প্রায় ৬৬ হাজার করদাতার ঝুলে থাকা নিরীক্ষা (Audit) দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৪. বিশেষ ২৩টি কর বিরোধ নিষ্পত্তি: এর পাশাপাশি রাজস্বসংক্রান্ত বড় ধরণের ২৩টি কর বিরোধ বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, এসব নিরীক্ষা ও বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ ত্বরান্বিত হলে প্রকৃত করদাতাদের সুনির্দিষ্ট করদায় নির্ধারিত হবে এবং সরকারের পাওনা আদায় প্রক্রিয়া অনেক বেশি গতিশীল হবে। তবে ব্যবসায়ী সমাজের সদিচ্ছা, আইনি ব্যবস্থার নমনীয়তা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সুসমন্বয় না হলে ৮২ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল রাজস্ব উদ্ধার করা কেবল এনবিআরের একার পক্ষে অসম্ভব বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *