হামে মৃত ৮২ শতাংশ শিশু মায়ের দুধ-বঞ্চিত: গবেষণা

স্বাস্থ্য স্লাইড

 

দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শিশুদের ৮২ শতাংশই জন্মের পর প্রথম ৬ মাস পর্যাপ্ত মায়ের বুকের দুধ পায়নি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টির শিকার ছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আয়োজিত সভায় গবেষণার এ ফলাফল তুলে ধরা হয়।

সভায় গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র ডিরেক্টর ড. মুস্তাফিজুর রহমান। শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত, বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী। এ সময় জানানো হয়, এ বছর মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ও হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৪১ শিশুর ওপর গবেষণাটি করা হয়েছে। এটি এখনো চলমান রয়েছে।

গবেষণার মূল প্রবন্ধে বলা হয়, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স ছিল ৩ থেকে ৯ মাসের মধ্যে। আক্রান্তদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গভাবে মায়ের বুকের দুধ পায়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়ার হার ছিল আরও বেশি। ৮২ শতাংশই শিশুই প্রথম ৬ মাস মায়ের দুধ খেতে পায়নি।

গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাদের মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টি এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি মাত্রার অপুষ্টির শিকার ছিল।

গবেষকরা বয়স ও টিকা নেওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে ৩৪১ শিশুকে চারটি দলে ভাগ করে বিশ্লেষণ করেন। নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়স হয়নি এমন ৯ মাসের কম বয়সি ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে, টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও টিকা না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ হার ৯৭ শতাংশ।

এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা ৯২ শতাংশ। আর সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ হার ৭৬ শতাংশ।

তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছে-গবেষণার এই তথ্যের অর্থ এমন নয়। কারণ গবেষণাটি সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত হয়নি; হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি হওয়া নির্দিষ্ট শিশুদের ওপরই এটি পরিচালিত হয়েছে। ফলে দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ সন্দেহভাজন শিশুর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি বা ব্যক্তিভেদে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ সংক্রমণের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের শরীরে শনাক্ত হওয়া হাম ভাইরাসের ধরনও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, শনাক্ত হওয়া সব হাম ভাইরাসই বি৩ সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গেও এসব ভাইরাসের মিল রয়েছে। পাশাপাশি ভাইরাসের এইচ (ঐ) প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে এমন এপিটোপ (অ্যান্টিজেনিক নির্ধারক) অঞ্চলে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।

হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু : এদিকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে দেশে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ১৮ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯২২ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৯ জন এবং হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৮২৩ জনের। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদন বলেছে, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ১৮ জনের মধ্যে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত ৮৭ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৮ হাজার ৭৬ জন। অন্যদিকে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ মিলেছে ৯৩১ জনের শরীরে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত মোট হাম উপসর্গ দেখা গেছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জনের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *