দেশের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ফল বিপর্যয় ঘটেছে। ১২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই অকৃতকার্য হয়েছেন। বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের এই নজিরবিহীন ফেলের ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ইংরেজিতে আড়াই লাখ, আইসিটিতে পৌনে দেড় লাখ শিক্ষার্থীর ভরাডুবি
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। সর্বমোট পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এবারের ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, শুধু ইংরেজি বিষয়েই ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী। পাশাপাশি, আইসিটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, বিশাল এই ফেল করা শিক্ষার্থীর সিংহভাগই এই দুটি প্রধান ও আবশ্যিক বিষয়ে হোঁচট খেয়েছেন।
শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি ও উদ্বেগজনক চিত্র
ফল বিপর্যয়ের এই চিত্র কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক মানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এবার দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। যা গত বছরের তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত বছর শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। যা তৃণমূল পর্যায়ের কলেজগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশাকেই ফুটিয়ে তোলে।
তুলনামূলক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৪ সালের পর এটিই দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পাসের হার। ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ শতাংশ। দীর্ঘ দুই দশক পর পাসের হার আবার এতটা নিচে নেমে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। দুর্বল ভিত্তি, করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং আধুনিক পাঠদানে ঘাটতিকেই এই বিপর্যয়ের পেছনের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগের ঘোষণা
ফল বিপর্যয়ের এই প্রেক্ষাপটে হতাশ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বস্তির খবর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও স্পষ্ট করে জানান, যে শিক্ষার্থী যে কয়টি বিষয়ে ফেল করেছে, তাদেরকে শুধু সেই নির্দিষ্ট বিষয়গুলোতে পুনরায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা হবে। সরকারের এই দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের শিক্ষাজীবনের মূল্যবান একটি বছর নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায়, সেই ব্যবস্থাপনাই এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।
