শ্রমিক অসন্তোষে এক দিনে বন্ধ ৫২৯ পোশাক কারখানা, সংকটে দেশের রপ্তানি খাত

অর্থনীতি স্লাইড

শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংস আন্দোলনের জেরে এক দিনে দেশের শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে কাজ ফেলে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া তীব্র শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-র তথ্য মতে, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার ও আশুলিয়া এলাকার আওতাধীন ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে কার্যদিবসের শুরুতে ১ হাজার ৮১৬টি চালু করা সম্ভব হলেও দিনশেষে অসন্তোষের মুখে বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যে অন্তত ৫২৯টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিরপুরের ৬৮টি কারখানার প্রায় ৫১ হাজার ৬২৫ জন শ্রমিক, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের ২৭৬টি কারখানার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিক এবং সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকার ১৮৫টি কারখানার ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ জন শ্রমিক কাজ বন্ধ রেখে রাজপথে নেমে আসেন এবং কর্মস্থল ত্যাগ করেন।

উদ্ভূত এই জরুরি পরিস্থিতিতে সার্বিক উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণে বিকেলে বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৫০ জনের বেশি উদ্যোক্তা ও প্রায় ৭০০ কারখানার প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, মালিকপক্ষ শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কারখানা সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার মতো নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ বজায় না থাকলে মালিকদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ৬ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি ছাড়াও নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে। শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন যে, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির কথা বিবেচনা করেই سریع পদক্ষেপ হিসেবে বোর্ডটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রী দ্রুত পর্যালোচনা শেষ করে উপযুক্ত ও সম্মানজনক মজুরি নির্ধারণের আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে অবিলম্বে কাজে ফেরার আহ্বান জানান।

তবে সরকার ও মালিকদের আহ্বানের পরও মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং একাধিক যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো চরম সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানান, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, অস্থিতিশীলতা তৈরির পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো চক্রান্ত ও ইন্ধন থাকলে তা কঠোর হাতে প্রতিহত করা হবে এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই চরম গোলযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম সতর্ক করে জানান, একই সাথে বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং সময়মতো তৈরি পোশাক জাহাজীকরণ (শিপমেন্ট) নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু সহিংসতার পথ বজায় থাকলে তা কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং সমগ্র শিল্প খাতকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *