এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা: দুই মাসে ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই দেশের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিশাল অংকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে রাজস্ব খাতের এই উদ্বেগের চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ গত জুলাই ও আগস্টে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে এনবিআর আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসের ব্যবধানে নিট রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রথম দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৮.৫৫ শতাংশ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে, অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সময় পার হলেও লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই অধরা রয়ে গেছে।

সাধারণত প্রতি মাসেই এনবিআর তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ ও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সংস্থাটি সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের কোনো বিবরণী প্রকাশ করেনি। জিইডি মূলত এনবিআর থেকে সংগৃহীত অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল আগস্ট মাসেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ফলে ওই এক মাসেই ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। তবে আশার কথা হলো—গত বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে রাজস্ব আদায় ৭.৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

জিইডির প্রতিবেদনে খাতভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। আগস্ট মাসে প্রধান খাতগুলোর ঘাটতির পরিমাণ নিচে তুলে ধরা হলো:

ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর): ৬ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা।

আয়কর ও ভ্রমণ কর: ৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।

আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক: ২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

টানা দ্বিতীয় মাসের মতো রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকায় কর আইন ও নিয়মকানুনের যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে জিইডি।

চল চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। চলতি বাজেটে ভ্যাট রিটার্ন জমাদানের নিয়মে পরিবর্তন এনে তা ‘তিন মাস পরপর’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ব্যবসায়িক লেনদেন ও ভ্যাট প্রদানে এক ধরনের ধীরগতি তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সার্বিক রাজস্ব আয়ে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার পুনরায় মাসিক ভ্যাট রিটার্ন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো স্থিতিশীল থাকলেও বিভিন্ন খাতের অগ্রগতির মধ্যে যথেষ্ট অসমতা রয়েছে।

বৈদেশিক খাত ও রিজার্ভ: শক্তিশালী প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক খাত বেশ স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়: বাজারে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের গতি অত্যন্ত ধীর। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের চাপ দিন দিন বাড়ছে।

মজুরি বনাম মূল্যস্ফীতি: প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। গত আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে পণ্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে মজুরি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো উদ্বৃত্ত অর্থ বা তারল্য থাকলেও তা বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগছে না। প্রতিবেদনে এই দুই খাতের বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে:

আমানত প্রবৃদ্ধি: গত আগস্ট মাসে ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১১.৯৬ শতাংশ।

ঋণ প্রবৃদ্ধি: অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ।

ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ জমা থাকলেও বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিচ্ছেন না। এই সংকট উত্তরণে বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের ব্যয় (সুদের হার) কমানো, ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

আগামী মাসগুলোতে দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও গতিশীল রাখতে জিইডি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছে:

১. রাজস্ব ব্যবস্থার কড়াকড়ি: কর আদায় ও ফাঁকি রোধে নিয়মনীতির কঠোর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

২. প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ: বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করা, যাতে অর্থনীতিতে অর্থের গতি বাড়ে।

৩. বিনিময় হার ও প্রতিযোগিতা: আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বজায় রাখতে বাস্তবসম্মত বিনিময় হার ধরে রাখা।

৪. রপ্তানি বহুমুখীকরণ: শুধু নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো।

সবমিলিয়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে দেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *