নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি: শীর্ষ পাঁচ দেশেই ৫৭ শতাংশ

অর্থনীতি স্লাইড

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় এক অনন্য দিগন্ত উন্মোচন করেছে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলো। তবে অপ্রচলিত বাজারের পরিধি বিস্তৃত হলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সিংহভাগই নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, নতুন বাজারগুলোতে পাঠানো মোট তৈরি পোশাকের প্রায় ৫৭ শতাংশই অর্জিত হচ্ছে মাত্র পাঁচটি শীর্ষ দেশ থেকে। দেশগুলো হলো—জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক এবং দক্ষিণ কোরিয়া।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ সংগৃহীত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) অপ্রচলিত বা নতুন বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই আয়ের মধ্যে উল্লিখিত শীর্ষ পাঁচটি দেশ থেকেই অর্জিত হয়েছে ১ হাজার ২৫ দশমিক ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানির মোট আয়ের ৫৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই পাঁচ দেশে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৩৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এই শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ বা প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার।

এক নজরে নতুন ৫ শীর্ষ বাজারের চিত্র:

  • জাপান (শীর্ষ গন্তব্য): নতুন বা অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জাপানে ৩৪৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা নতুন বাজারের মোট আয়ের ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জাপানে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
  • অস্ট্রেলিয়া (দ্বিতীয় স্থান): নতুন বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়া। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশটিতে ২০৯ দশমিক ০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১ দশমিক ০২ শতাংশ।
  • ভারত (তৃতীয় স্থান ও একক ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি): আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্থান পেয়েছে ৩য় অবস্থানে, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০৪ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলার। তবে শীর্ষ পাঁচ বাজারের মধ্যে একমাত্র ভারতেই রপ্তানির চিত্র বিপরীতমুখী। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভারতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
  • তুরস্ক (বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধি): প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে তুরস্ক। আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তুরস্কে যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৫ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার, সেখানে চলতি অর্থবছরে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৬ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলারে। এর ফলে দেশটিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
  • দক্ষিণ কোরিয়া (পঞ্চম স্থান): তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা পূর্ব এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় আলোচ্য তিন মাসে ১২০ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারের পোশাক পাঠানো হয়েছে। এতে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।

রপ্তানি বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি তুরস্ক ইপিবির ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন পাঁচ শীর্ষ বাজারে পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক বৃদ্ধিতে মূলত তুরস্কের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বড়। প্রথম প্রান্তিকে এই পাঁচ দেশে যৌথভাবে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৮৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে এককভাবে তুরস্কেই রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার, যা শীর্ষ পাঁচ দেশের অর্জিত মোট বৃদ্ধির প্রায় ৯০ শতাংশের সমান। সহজ কথায়, তুরস্কের এই উল্লম্ফন বাদ দিলে বাকি চার দেশে (জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া) সম্মিলিত রপ্তানি বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ০৪ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর মাসের একক পারফরম্যান্স একক মাস হিসেবে সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে নতুন এই পাঁচ দেশে রপ্তানির গতি আরও বেশি বেগবান ছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ২৯৫ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪৫ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলারে। ফলে সেপ্টেম্বর মাসে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর মাসেও প্রবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া:

  • তুরস্ক: সেপ্টেম্বরে এক মাসেই দেশটিতে রপ্তানি ২২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলারে।
  • দক্ষিণ কোরিয়া: ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলারে।
  • জাপান: ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১১৬ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন ডলার।

তবে সার্বিক প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি থাকলেও একক মাস হিসেবে সেপ্টেম্বরে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া—দুই দেশেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। সেপ্টেম্বরে ভারতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ০ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় কমেছে ০ দশমিক ১৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহ্যগত বাজার (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন)-এর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অপ্রচলিত বাজারে শেয়ার বাড়ানোর যে প্রচেষ্টা পোশাক খাত শুরু করেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে নতুন বাজারের অর্ধেকের বেশি আয় মাত্র ৫টি দেশের ওপর নির্ভর করায় বাজার বৈচিত্র্যায়নের ঝুঁকি এখনও থেকে যাচ্ছে। তাই তুরস্কের মতো বাকি দেশগুলোতেও তৈরি পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভারতের মতো দরপতনের বাজারগুলোতে কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *