বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার খাতা-কলমে বড় অংকের সাফল্য দেখা গেলেও বাস্তবে জাতীয় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন এবং নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এক বিশাল প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় ও আংশিক ব্ল্যাকআউটের মতো ঘটনা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বিদ্যুৎ খাতের সুরক্ষাবেষ্টনী এখনও কতটা নড়বড়ে। উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদা থেকে অনেকটাই বেশি থাকা সত্ত্বেও সঠিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সঞ্চালন অবকাঠামো এবং নির্ভরযোগ্য স্পিনিং রিজার্ভের অভাবে সামান্য কারিগরি ত্রুটিও দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এক বিশৃঙ্খল লোডশেডিং ও ব্ল্যাকআউট আতঙ্কে।
সাম্প্রতিক সময়ে মেঘনাঘাট অঞ্চলের জাতীয় গ্রিডে কারিগরি বিভ্রাট ঘটে যাওয়ার পর রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম এবং সিলেটসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন কেবল চাহিদা মেটানোর স্তরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি নতুন প্রযুক্তির রূপান্তরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আগামী দিনে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিশাল ক্ষমতার ধ্রুবক বিদ্যুৎ এবং সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস, বিশেষ করে সৌরশক্তি থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আধুনিক ও সংবেদনশীল এসব বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার আগে যদি গ্রিডের মূল পরিকাঠামো সুদৃঢ় ও স্বয়ংক্রিয় না করা যায়, তবে আগামীতে গ্রিড বিপর্যয়ের মাত্রা ও ব্যাপ্তি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের প্রধান দুর্বলতাগুলোর অন্যতম হলো কার্যকর ‘স্পিনিং রিজার্ভ’ বা আকস্মিক ঘাটতি তাৎক্ষণিক পূরণ করার ব্যাপরি সজ্জা না থাকা। দেশে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের সংস্থান সময়মতো না হওয়ায় কারখানাগুলো সব সময় প্রস্তুত রাখা যায় না। ফলে কোনো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বিদেশ থেকে আসা আমদানিকৃত বিদ্যুতের লাইন যদি আকস্মিক কোনো যন্ত্রাংশের ত্রুটি বা কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিকল্প কেন্দ্র থেকে এক নিমেষে ফ্রিকোয়েন্সি ধরে রেখে বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে ঢালা সম্ভব হয় না। এতে ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয় এবং ক্যাসকেডিং ইফেক্টের দরুন গ্রিড সুরক্ষার অটোমেটিক ট্রিপিং ব্যবস্থার কারণে একের পর এক কেন্দ্র বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা পারমাণবিক বিদ্যুতের বৈশিষ্ট্য প্রচলিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌরবিদ্যুৎ আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর ওঠানামা খুব দ্রুত ঘটে। সূর্যালোক কমে গেলে যদি অবিলম্বে অন্য কোনো ব্যাকআপ বা ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) সাড়া না দেয়, তবে গ্রিড ভেঙে পড়তে পারে। অনুরূপভাবে পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো ভারী সিস্টেম হঠাৎ ট্রিপ করলে তা সামাল দেওয়ার জন্য শক্তিশালী প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও স্মার্ট গ্রিড জরুরি। বিপিডিবি ও পিজিসিবির কর্মকর্তারা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিয়মিত তা মেরামতের আশ্বাস দিলেও বাস্তব চিত্র বলছে, গত এক দশকে ২০১৭ সালের জাতীয় বিপর্যয়, ২০২২ ও ২০২৩ সালের বড় দুর্ঘটনা এবং সম্প্রতি আমিনবাজার গ্রিড উপকেন্দ্রের একের পর এক বিস্ফোরণ ও ত্রুটি থেকে কার্যকর শিক্ষা নেওয়া হয়নি। গ্রিডের প্রতিটি স্পর্শকাতর পয়েন্টে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, স্মার্ট মিটারিং, উন্নত প্রটেকশন স্কিম এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে সামনে বড় বিপর্যয় রোখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
