জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যানারি মিটিংয়ে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা আনুষ্ঠানিকভাবে আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে এখন থেকে প্রায় তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ এই ঐতিহাসিক ও রূপান্তরমূলক উত্তরণের চূড়ান্ত ধাপে পা রাখবে। বিশ্বমঞ্চে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নানামুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই এই সময় বাড়ানোর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্ত এসেছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই প্ল্যানারি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান, যা ইউএন ওয়েব টিভির মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সভার শুরুতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোর্চা জি-৭৭-এর পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর খসড়া প্রস্তাবটি প্লেনারি সভায় উত্থাপন করেন। প্রস্তাব উত্থাপনের পর উপস্থিত কোনো দেশের প্রতিনিধি এর বিরোধিতা করেননি। বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী দেশ ও জোটগুলো এই উদ্যোগের প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধি ছাড়াও কানাডা ও ফ্রান্সের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ও নেপালের গ্র্যাজুয়েশন বা উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবের পক্ষে ইতিবাচক বক্তব্য রাখেন। তবে একই সঙ্গে তাদের বক্তব্যে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন জরুরি সংস্কার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)—বাংলাদেশ সরকারের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে—উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর এই অনুরোধটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছিল। জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্ত সদস্য দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন সূচক ও অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করে গঠিত ‘কমিটেসি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ বা সিডিপির ইতিবাচক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই ইকোসক এই সুপারিশ প্রণয়ন করেছিল। অবশেষে সাধারণ পরিষদের এই প্লেনারি অধিবেশনে কোনো ধরনের দ্বিমত ছাড়াই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়ার পথ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হলো।
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকা বাংলাদেশ দীর্ঘ পথ পরিক্রমা পেরিয়ে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হওয়ার কথা ছিল। জাতিসংঘ সাধারণত বিশ্বের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে উন্নত ও উন্নয়নশীল—এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত করে থাকে। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যে সমস্ত রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ সূচকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে এবং আন্তর্জাতিক বা বহুপক্ষীয় বিশেষ সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাদেরকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ বা এলডিসি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যেসব বিশেষ সুবিধা, শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং নমনীয় ঋণ বা অনুদানের সুযোগ পেয়ে আসছে, তা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে প্রবেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য দেশের স্থানীয় শিল্প ও রপ্তানি খাতকে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়ার ফলে দেশীয় অর্থনীতি কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের ধাক্কা এড়াতে এই বর্ধিত সময় কার্যকর প্রস্তুতি নিতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
