প্রাথমিকে ভর্তি পরীক্ষা ও অতিরিক্ত বই নিষিদ্ধের দাবিতে আইনি নোটিশ

শিক্ষা স্লাইড

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ রোধ, শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব রক্ষা এবং তাদের ওপর থেকে মানসিক ও শারীরিক চাপ কমানোর দাবিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের ভর্তি পরীক্ষা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা, প্লে, নার্সারি ও কেজির মতো অননুমোদিত প্রাক-প্রাথমিক কোর্স বন্ধ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারিত বইয়ের বাইরে অতিরিক্ত গাইড, ওয়ার্কবুক বা সহায়ক বই চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী মো গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই নোটিশ প্রেরণ করেন।

নোটিশের মূল প্রাপকদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং এনসিটিবির চেয়ারম্যান। নোটিশ পাওয়ার পর আগামী ৫ দিনের মধ্যে শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় শিশুদের মৌলিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার্থে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বার্থে রিট আবেদন দায়ের করা হবে বলে আইনি সতর্কবার্তায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী বাণিজ্যিক শিক্ষা কার্যক্রম আইনি নোটিশে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ এবং প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইন, ১৯৯০-এর বিধানগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন, গণমুখী, বাধ্যতামূলক ও কল্যাণমুখী করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে কতিপয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে এক ধরনের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী কোমলমতি শিশুদের বয়স অনুপাতে অতিরিক্ত পড়াশোনার যাতাকলে পিষ্ট করা হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় বিকাশের জন্যই মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

অননুমোদিত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার নামে মানসিক নির্যাতন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় ত্রুটি হিসেবে প্লে, নার্সারি, কেজি-১ ও কেজি-২-এর মতো একাধিক অননুমোদিত প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিশুদের জোরপূর্বক ভর্তি করানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রথম শ্রেণিতে বা প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্বনামধন্য ও সাধারণ প্রতিষ্ঠানে লিখিত পরীক্ষা, স্ক্রিনিং টেস্ট এবং মৌখিক বা ভাইভা গ্রহণের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। আইনজীবীর মতে, অবুঝ বয়সে এ ধরনের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার ফলে শিশুদের কচি মনে স্থায়ী ভীতি, তীব্র মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা এবং আত্মবিশ্বাসের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়। অথচ এই বয়সে শিশুদের আনন্দময় পরিবেশে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে বড় হওয়ার কথা। তাই প্রাথমিক স্তরে সব ধরনের ভর্তি পরীক্ষা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার অভিশাপ এনসিটিবি নির্ধারিত অনুমোদিত বোর্ড বইয়ের বাইরে অতিরিক্ত ব্যাকরণ বই, বিভিন্ন প্রকাশনার সহায়ক বই ও ভারী ওয়ার্কবুক শিশুদের ব্যাগে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নোটিশে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। কিছু অসাধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থার অনৈতিক যোগসাজশে কোমলমতি শিশুদের ওপর এই সিলেবাসের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হচ্ছে। এর ফলে শিশুরা শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং দীর্ঘমেয়াদি হতাশার শিকার হচ্ছে। শৈশব থেকেই শিশুদের মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার ঘাণিতে আটকে না রেখে তাদের মুক্তচিন্তা, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশের সুযোগ দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের বাণিজ্যিক চাপ সংবিধানের ১৭, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত শিক্ষার সুযোগ, সমতা, আইনের সুরক্ষা এবং ব্যক্তির জীবন ও সত্তার নিরাপত্তার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম ও কঠোর শাস্তির হুশিয়ারি আইনি নোটিশে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ১. আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে অননুমোদিত সকল প্রাক-প্রাথমিক কোর্স বা শ্রেণি অবিলম্বে বন্ধ করা। ২. প্রাথমিক স্তরের ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে সব ধরনের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা চিরতরে নিষিদ্ধ করা। ৩. এনসিটিবির বোর্ড বইয়ের বাইরে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বই চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিবন্ধন বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৪. উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিবিড় তদারকি দল বা মনিটরিং সেল গঠন করে এই আদেশ বাস্তবায়নের পথ সুগম করা।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে কোনো ইতিবাচক বা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এবং দেশের শিক্ষা খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না বলে নোটিশে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *