আইএমএফের শঙ্কা: চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১% হতে পারে

অর্থনীতি স্লাইড

দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বার্ষিক সভা। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ সংস্করণের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যে প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির নতুন হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সাথে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রাকে চরম চাপের মুখে ফেলে গড় মূল্যস্ফীতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশে (প্রায় ১১%) গিয়ে ঠেকতে পারে।

চলমান এই বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে প্রকাশিত আইএমএফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাংলাদেশের চূড়ান্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকতে পারে ৩.৬ শতাংশ এবং ওই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৭ শতাংশ। অর্থাৎ একদিকে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে দ্বিগুণ অংকের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ—উভয় দিক থেকেই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির সার্বিক চিত্র ও আইএমএফের প্রাক্কলন

আইএমএফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে অবস্থান করলেও ২০২৭ সাল নাগাদ তা কিছুটা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে স্থিতিশীলতার দিকে এগোলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা ও মূল্যস্ফীতির তীব্র ধাক্কার কারণে সেই ইতিবাচক ধারার সুফল থেকে অনেকটাই দূরে থাকছে।

প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ হ্রাসের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পৃথক বিশ্লেষণে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত গতি বজায় না থাকা অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথগতি নেমে এলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগগুলো সংকুচিত হয়ে যায়।

বেসরকারি খাতের স্থবিরতা: বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি না পেলে শিল্প কারখানার উৎপাদনশীলতা, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক জনস্রোতের আয় বৃদ্ধির গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

ক্রয়ক্ষমতার চরম সংকট: প্রায় ১১ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা ভয়াবহভাবে হ্রাস পাবে। এর ফলে সমাজে সবচেয়ে বেশি ও মারাত্মক চাপে পড়বেন নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যম আয়ের মানুষেরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া দামের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান তলানিতে ঠেকতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: কাঠামোগত দুর্বলতা ও সংকট

আইএমএফের এই প্রাক্কলনের পাশাপাশি সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬ সংস্করণের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনেও দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির প্রধান সংকটগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে:

উৎপাদনে বিঘ্ন: দেশের প্রধান শিল্প কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা: ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা খেলাপি ঋণের বেপরোয়া বৃদ্ধি এবং মূলধন–ঘাটতি গোটা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলছে।

বিনিয়োগ খরা: উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অন্যান্য কাঠামোগত সংকটের কারণে নতুন কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগের গতিতে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা বিরাজ করছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় বড় গলদ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে সার বাবদ প্রতি বছর বিশাল অংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। কিন্তু সুশাসনের অভাব ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণে এই সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশই প্রকৃত ও হতদরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

দেখা গেছে, সমাজের বহু সচ্ছল ও প্রভাবশালী পরিবার অনৈতিক উপায়ে এসব সরকারি সুবিধার ভাগ বসাচ্ছে, অথচ প্রকৃত অর্থে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্রতম বহু পরিবার সম্পূর্ণভাবে সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের জরুরি সংস্কার প্রস্তাব

দেশের বর্তমান বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক এই দুই আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সংস্কারের সুপারিশ করেছে:

১. ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা: আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার এবং ব্যাংক খাতের সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

২. জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: শিল্প কারখানার চাকা সচল রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদনমুখী পরিবেশ তৈরি করা।

৩. রাজস্ব আয় বৃদ্ধি: কর জালের পরিধি বাড়িয়ে এবং করপোরেট ও প্রত্যক্ষ কর আদায় স্বচ্ছ করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো।

৪. ভর্তুকি সংস্কার ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা: সাধারণ বা ঢালাও ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে সেই অর্থ কেবল সমাজের প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে সরাসরি ব্যবহার করা।

সবমিলিয়ে, আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির হার ১১ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এবং প্রবৃদ্ধি আরও মন্থর হওয়া—উভয় মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গভীর অশনিসংকেত তৈরি করেছে। এই বহুমুখী চাপ মোকাবিলায় অবিলম্বে কাঠামোগত সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *