জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আহরণ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। কর ফাঁকি রোধ, নতুন করদাতা সনাক্তকরণ এবং রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্বিক সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশমালা গ্রহণ করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সমন্বিত তথ্যভান্ডারের ব্যবহার
এনবিআরের করভান্ডারকে আরও আধুনিক ও নির্ভুল করতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজের সঙ্গে একে যুক্ত করার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনার আওতায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ব্যাংক হিসাবের তথ্য, ভূমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের বিবরণী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যানবাহনের তথ্য, সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের হিসাব এবং নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের তথ্য সরাসরি এনবিআরের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
এই সমন্বিত ডেটার ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রযুক্তিগত এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো—সম্ভাব্য করদাতাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা এবং তাদের প্রকৃত আয় ও সম্পদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রোফাইল বা পরিচিতি তৈরি করা। এর ফলে, কোনো ব্যক্তি তাঁর বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে (ট্যাক্স রিটার্ন) যে তথ্যাদি প্রদান করবেন, তার সঙ্গে ব্যাংক ডেস্কে থাকা আমানত, স্থাবর সম্পদ (জমি ও ফ্ল্যাট), মালিকানাধীন যানবাহন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এবং বিদেশে যাতায়াতের খরচের তথ্য সহজে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে। আয় গোপন করার কিংবা প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ কম দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার পুরনো প্রবণতা রোধে এ প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের জবাবদিহি ও সম্পদের হিসাব
কর আদায় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এনবিআরের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতিমুক্ত রাখা ও জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সদস্য মো. সাইফুল আলম বিশেষ জোর দিয়ে এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংস্থাটির চেয়ারম্যান এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী নিয়মিতভাবে দাখিলের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
কমিটি সুপারিশ করেছে যে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরে সততা বজায় রাখতে এনবিআর কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয়ের হিসাব ও সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী দাখিল এবং তা নিয়মিত যাচাইকরণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, কর নির্ধারণ ও আদায় প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে এনে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেওয়া হয়।
এর জবাবে এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকারি নির্দেশনা মেনে ২০২৫ সালে সংস্থাটির সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ইতোমধ্যে তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণী দাখিল করেছেন। আগামী দিনগুলোতেও এই কার্যক্রম নিয়মিতভাবে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই অব্যাহত রাখা হবে।
রাজস্ব আদায়ের ব্যয় ও দেশের অবস্থান
বৈঠকে রাজস্ব সংগ্রাহক হিসেবে এনবিআরের প্রশাসনিক দক্ষতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১০০ টাকা রাজস্ব আদায় করতে মাত্র ২১ পয়সা প্রশাসনিক ব্যয় হয়। বিশ্বের ও আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক খরচের তুলনায় বাংলাদেশের এই ব্যয় বেশ কম।
উদাহরণস্বরূপ, জাপানে সমপরিমাণ অর্থাৎ ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে খরচ হয় ১ টাকা ৩ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৭১ পয়সা এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যয় হয় ৬০ পয়সা। উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশ কম খরচে বাংলাদেশে রাজস্ব সংগৃহীত হলেও, সেবার মান ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তিভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
এনবিআর তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব সংগ্রহের পরিসংখ্যান ও আগামী দিনের বিশাল লক্ষ্যমাত্রার তথ্য কমিটির সামনে তুলে ধরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের সংগৃহীত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা গত ২৫ বছরের ব্যবধানে প্রায় ২০ দশমিক ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট সরকারি রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ একা এনবিআর-ই সংগ্রহ করে থাকে।
তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের সামনে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রাটি সরকারের মোট প্রস্তাবিত বাজেট ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং মোট প্রাক্কলিত রাজস্বের ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।
সংসদীয় কমিটির সদস্যরা এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কমিটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যেসব করদাতা নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা (Tax Net) প্রসারিত করতে হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ধারী ব্যক্তি রয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪৭ লাখ লোক নিয়মিত আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন দাখিল করেন। অর্থাৎ, টিআইএন থাকা সত্ত্বেও একটি বিশালসংখ্যক নাগরিক নিয়মিত কর ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়ে গেছেন। এই বিপুল পরিমাণ অনিয়মিত টিআইএন ধারীদের রিটার্ন দাখিলের আওতায় আনাই রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান সুযোগ হতে পারে।
কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির রোডম্যাপ
উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে বাংলাদেশের কর-জিডিপি (Tax-to-GDP Ratio) অনুপাত বাড়ানো অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা আঞ্চলিক মানদণ্ডে বেশ কম।
সরকার ও এনবিআর যৌথভাবে এই অনুপাত বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট টাইমলাইন তৈরি করেছে:
- ২০২৬ সাল: ৮ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করা।
- মধ্যমেয়াদী লক্ষ্য: ১০ শতাংশ অর্জন।
- ২০৩৫ সাল: ১৫ শতাংশে রূপান্তর করা।
এই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনে কেবল করের হার বাড়ানো সমাধান নয়; বরং নতুন নতুন করদাতা চিহ্নিত করা, ফাঁকি বন্ধ করা, প্রকৃত আয়ের ওপর করধার্য করা এবং পুরো ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধির বিষয়ে একমত প্রকাশ করা হয়।
কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও হয়রানি হ্রাস
রাজস্ব খাতের প্রশাসনিক দুর্নীতি, লালফিতার দৌরাত্ম্য এবং হয়রানি কমানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কর ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মন্তব্য করেন যে, করদাতা ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যত বেশি থাকবে, ব্যবস্থাটিকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করা ততটাই কঠিন হবে।
বর্তমানে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্য পরিচালনা করা বেশ জটিল। নতুন ব্যবসা শুরু করতে ১৯টি আলাদা অনুমোদন এবং একটি কোম্পানি সচল রাখতে বছরে প্রায় ৩০টি সনদ সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের ঘন ঘন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ছুটতে হয়।
এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে এনবিআর পুরো আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থাকে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত (End-to-End) পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: ১. অনলাইনে সার্বিক আয়কর বিবরণী দাখিলের পূর্ণ সুবিধা। ২. উৎসে করের (TDS) ডেটাভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা। ৩. অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কর ও ভ্যাট জমা প্রদান। ৪. ই-রিফান্ড বা অনলাইনে করের অর্থ ফেরতের সুব্যবস্থা।
স্বয়ংক্রিয় এই ডিজিটাল ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে ব্যক্তিগত প্রভাবে কর নির্ধারণ করা বা অন্যায্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে এবং করদাতারা অযথা হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন।
ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ও সৎ করদাতাদের সুরক্ষা
প্রথাগত ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে অডিট পরিচালনার প্রথা বন্ধে ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা (Risk-based Audit) পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট করদাতার ২ শতাংশেরও কম অডিটের আওতায় আসেন।
২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে সিস্টেম-জেনারেটেড বা যন্ত্রনির্ভর উপায়ে অটোমেটেড পদ্ধতিতে অডিটের জন্য ফাইল নির্বাচন করা হচ্ছে, যাতে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত হাত না থাকে। এই আধুনিক ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর হলে যারা সঠিক নিয়ম মেনে রাজস্ব দিচ্ছেন, তাঁরা অযাচিত অডিট ও হয়রানি থেকে রেহাই পাবেন। একই সঙ্গে, যারা প্রকৃত আয় গোপন করে কম কর জমা দিচ্ছেন, সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে অডিটের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
শুল্ক ও ভ্যাটের সমন্বিত ডাটা নেটওয়ার্ক (ইডিআই)
শুধু আয়কর নয়, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগেও আনা হচ্ছে বৈপ্লবিক সমন্বয়। ভ্যাট আদায় বৃদ্ধিতে শতভাগ অনলাইন বিবরণী জমা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পিওএস বা হিসাব ব্যবস্থার সঙ্গে এনবিআরের সার্ভারের সরাসরি সংযোগ, অনলাইন চালান ইস্যু এবং তামাকজাত পণ্যের মতো সংবেদনশীল খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ ট্র্যাক করার ট্র্যাকিং প্রযুক্তি চালুর কাজ চলছে।
ভবিষ্যতে এনবিআরের আওতাধীন তিনটি প্রধান বিভাগ—আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক—এর মধ্যে তথ্যের অবাধ আদান-প্রদানের জন্য ‘ইলেকট্রনিক ডাটা ইন্টারচেঞ্জ’ (EDI) ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। শুল্ক বিভাগে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত পণ্যের চালান, ব্যাংক এলসি ও পোর্ট বা বন্দরের ডাটার মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয় থাকবে। এর ফলে পণ্য খালাসে গতি আসবে, মিথ্যা ঘোষণায় কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অপচেষ্টা বন্ধ করা সহজ হবে।
তীব্র জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো
বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ও আধুনিক পরিকল্পনার বিপরীতে এনবিআরের অবকাঠামোগত ও জনবল ঘাটতিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আয়কর বিভাগে বর্তমানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১২,৭৬৪টি হলেও সমগ্র এনবিআরের মোট অনুমোদিত পদের মাত্র ৫৮ শতাংশে জনবল কর্মরত রয়েছে। প্রায় ৪২ শতাংশ পদ খালি রেখে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ এবং আধুনিক প্রযুক্তি বাস্তবায়ন বেশ কঠিন।
সংসদীয় কমিটি উল্লেখ করেছে, কেবল বড় রাজস্বের লক্ষ্য বেঁধে দিলেই সাফল্য আসবে না; লক্ষ্য অর্জনের উপযোগী নতুন পদ সৃষ্টি ও পূরণ, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত আইটি অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম এনবিআরকে সরবরাহ করতে হবে।
ভুয়া অডিট রিপোর্ট ও পেশাগত অনিয়মে কঠোর পদক্ষেপ
ব্যবসায়িক আর্থিক প্রতিবেদনের সঠিকতা রক্ষায় ভুয়া অডিট রিপোর্ট বা ভুয়া অডিটরদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অসৎ উপায়ে কম কর দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভুয়া বা তৈরি করা নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
যদি কোনো হিসাব নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান (Audit Firm) বা পেশাজীবীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অসত্য রিপোর্ট তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে প্রচলিত আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্টদের পেশাগত সনদ এবং অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ বাতিলের বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করা না গেলে পুরো কর কাঠামোর ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং সৎ ব্যবসায়ীরা অসৎদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
আগামী দিনের পথরেখা
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এই সময়োপযোগী ও সাহসী সুপারিশগুলো যদি সঠিক উপায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, সমন্বিত তথ্যের ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, শতভাগ ডিজিটালাইজেশন এবং কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন কর ফাঁকিদাতাদের সনাক্ত করা, প্রশাসনিক হয়রানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং করদাতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন এনবিআরের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
