আসন্ন জাতীয় বাজেটে উত্তরাধিকার কর চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে যে আলোচনা বা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকার আপাতত উত্তরাধিকার কর প্রবর্তনের পথে যাচ্ছে না এবং দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এই ধরনের কর চালুর সময় এখনও আসেনি।
শুক্রবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ট্যাকসেশন) অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে কর প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
উত্তরাধিকার কর নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সরকার শিগগিরই এই কর চালু করতে যাচ্ছে। বাস্তবে তা নয়। তিনি জানান, কর ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল এবং তারা বিভিন্ন ধরনের করনীতি নিয়ে সুপারিশ দিয়েছে। সেই সুপারিশগুলোর মধ্যে উত্তরাধিকার করের বিষয়টিও ছিল। তবে শুরু থেকেই তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, সম্পদ বণ্টনের ধরণ এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উন্নত দেশগুলোতে উত্তরাধিকার কর কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলেও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন। এ ধরনের কর চালু করতে হলে একটি সুসংগঠিত সম্পদ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য ডাটাবেস এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন—যা এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটেছে—একজন মন্ত্রী তাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, তিনি কি সত্যিই উত্তরাধিকার কর চালু করতে যাচ্ছেন। জবাবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এমন কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই এবং ভবিষ্যতেও তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
তবে উত্তরাধিকার কর না চালু করলেও এনবিআর একটি আধুনিক ‘ডাটাবেসভিত্তিক সম্পদ কর ব্যবস্থা’ চালুর বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে জানান চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কমপ্লিট ডাটাবেসড ওয়েলথ ট্যাক্স সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা কর ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এই ব্যবস্থায় আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সম্পদ কর রিটার্নও একসঙ্গে জমা দেওয়া যাবে, ফলে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ ও সমন্বিত হবে।
অতীতে সম্পদ কর কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি সম্পদের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা ও ব্যাপক মামলা-মোকদ্দমার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আগে সম্পদের মূল্যায়ন নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হতো, যা আদালতে দীর্ঘমেয়াদি লিটিগেশনে পরিণত হতো। নতুন ব্যবস্থায় এই সমস্যা দূর করতে আইনের মাধ্যমে মূল্যায়নের নির্দিষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হবে এবং পুরো হিসাব প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) করা হবে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান কর প্রশাসনের প্রচলিত ধ্যানধারণা ও কাজের ধরন পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর প্রশাসন একটি বদ্ধ ও বিভাগীয় (কম্পার্টমেন্টাল) কাঠামোর মধ্যে কাজ করছে, যেখানে এক বিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগের যোগাযোগ সীমিত। এর ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, মেধাবী কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যান, কারণ তাদের কাজের ধরন অত্যন্ত একঘেয়ে এবং ফাইলভিত্তিক। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে আরও গতিশীল, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন ধারণা, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। তিনি কর্মকর্তাদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, বিদেশে কোনো ফোরামে গেলে শুধু অংশগ্রহণ করলেই হবে না, সেখানে স্থায়ী যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে সদস্যপদ গ্রহণ বা নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংযোগ জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী এখন প্রত্যক্ষ কর (ডিরেক্ট ট্যাক্স) ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে, যা একটি দেশের রাজস্ব কাঠামোকে আরও স্থিতিশীল ও ন্যায়সংগত করে। বাংলাদেশকেও ধীরে ধীরে সেই দিকে অগ্রসর হতে হবে।
তার বক্তব্যে এক পর্যায়ে বিদায়ের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। তিনি বলেন, তার দায়িত্ব পালনের সময় প্রায় শেষের দিকে এবং তিনি এটিকে এক ধরনের বিদায়ী বক্তব্য হিসেবেই দেখছেন। এ সময় তিনি কর প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ—ই-টিডিএস (ইলেকট্রনিক ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স) ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের ‘রেভিনিউ মেশিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ই-টিডিএস ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে কর আদায়ে বিপ্লব ঘটবে। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক উইথহোল্ডিং অথরিটির জন্য এটি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে এবং সব লেনদেন ডিজিটালভাবে রেকর্ড থাকবে। ফলে করদাতারা যখন অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করবেন, তখন তাদের আয়ের বিভিন্ন উৎস থেকে কাটা করের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যাবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান অতীতের জটিল কর ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, আগে আমদানি পর্যায়ে দেওয়া করের ক্রেডিট পেতে করদাতাদের নানা ধাপ পার হতে হতো। ইন্সপেক্টর নিয়োগ দিয়ে বন্দর থেকে তথ্য যাচাই করতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করত। এখন সেই প্রক্রিয়া অনেকটাই সহজ করা হয়েছে।
বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত কর রিটার্ন জমার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে। কর কর্মকর্তাদের অ্যাসাইকুডা ডাটাবেসে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে, ফলে তারা সহজেই তথ্য যাচাই করতে পারছেন। এতে করদাতাদের ভোগান্তি কমেছে এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে অনেক সময় করদাতাদের ন্যায্য রিফান্ড পেতে জটিলতার সম্মুখীন হতে হতো। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে কর ক্রেডিট না দিয়ে রিফান্ড আটকে রাখার অভিযোগও ছিল, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যদি কোনো কারণে রিফান্ড প্রাপ্য হয়, তা অবশ্যই প্রদান করতে হবে।
এনবিআরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভুল নীতি শনাক্ত করে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা সঠিকভাবে মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
অডিট ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও তিনি কথা বলেন। আগে যেখানে কিছু করদাতার বারবার অডিট হতো, অন্যদিকে অনেকেই দীর্ঘদিন অডিটের বাইরে থাকতেন—এখন সেই বৈষম্য দূর করতে ঝুঁকিভিত্তিক (রিস্ক-বেইজড) অডিট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং করদাতাদের সঙ্গে কর প্রশাসনের সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবশেষে তিনি বলেন, করদাতাদের সঙ্গে কর প্রশাসনের সম্পর্ক অতীতে নানা কারণে কিছুটা তিক্ত হয়ে উঠেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই সম্পর্ক উন্নত করতে এনবিআর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।


