নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের জেরে ব্যাংকিং লেনদেন ও পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বাড়ছিল এবং রপ্তানিকারকেরা বছরে এক বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির আশা করেছিলেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ রাশিয়ায় ৬৬৫ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৬৩৮ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। এরপর তা কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫৭ দশমিক ২৬ মিলিয়নে নেমে এসেছে।
২০১১ সালে তুরস্ক বাংলাদেশের পোশাকের ওপর ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপ করার পর রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর আগে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মৌলিক পোশাক তুরস্কে যেত এবং সেখানকার রপ্তানিকারকেরা নিজেদের ব্র্যান্ডের নাম লাগিয়ে তা রাশিয়ায় পাঠাতেন। পরে বাড়তি শুল্কের কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা তুরস্কে সরাসরি পণ্য পাঠানো কমিয়ে রাশিয়ায় সরাসরি পোশাক রপ্তানি শুরু করেন। কিন্তু যুদ্ধের পর রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অর্থ পরিশোধে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, বেলারুশ ও জার্মানির মতো তৃতীয় দেশ হয়ে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে, এতে পরিবহন ব্যয় ও জটিলতা দুটোই বেড়েছে।
পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইয়াংফোরএভার টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব চৌধুরী বলেন, অর্থ লেনদেনের সমস্যার কারণে তিনি রাশিয়ায় রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছেন। যুদ্ধের আগে তিনি বছরে এক মিলিয়ন ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি করতেন। এক রুশ ক্রেতার কাছে এক লাখ ডলার পাওনা পেতে প্রায় তিন বছর আলোচনা করতে হয়েছে এবং পরে তৃতীয় দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়। তার মতে, এত সমস্যার পরও রাশিয়ার বাজার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়। প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে সেখানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পোশাকের চাহিদা এখনো ভালো। তবে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো বা ভিন্ন দেশের মুদ্রায় অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ না পাওয়ার ঝুঁকি এবং নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সুইফটে রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংকের প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকায় বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের এক বিলিয়ন ডলারের বেশি পাওনা রয়েছে। অনেক ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারক এখনো রাশিয়ার ক্রেতাদের কাছ থেকে তিন থেকে চার মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পাওনা পাননি। পোল্যান্ডের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এলপিপির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো পণ্যের পাওনা নিয়েও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। তাই রপ্তানিকারকেরা জাপান, তুরস্ক, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নতুন বাজারে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে যুদ্ধ শেষ হলে রাশিয়াকে আবারও বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজারে পরিণত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
