এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি, কঠোর অবস্থানে নির্বাচন কমিশন

জাতীয় স্লাইড

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের সুযোগ নিয়ে সম্পদ দখল, ভুয়া উত্তরাধিকার দাবি ও জাল পাসপোর্টের মতো জালিয়াতির চেষ্টা প্রতিরোধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অনিয়ম ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত, ফৌজদারি মামলা এবং গ্রেফতারের মতো চরম প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, জালিয়াতির প্রশ্নে কমিশন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পরেই কেবল এনআইডি সংশোধনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হচ্ছে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের নামে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকে আসল নাম পরিবর্তন করে অন্যের স্থাবর সম্পত্তি বেআইনিভাবে বিক্রি করে দিচ্ছেন, আবার অনেকে ভুয়া ওয়ারিশ সেজে উত্তরাধিকার সম্পত্তি দাবি করছেন। এমনকি এনআইডির তথ্য জাল করে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। এসব অপরাধে সহায়তার প্রমাণ পাওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তার এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক আবেদনে পিতা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান মাত্র ৩ বছর বা মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান ২ থেকে ৩ বছর হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। আবার অনেকেরই রয়েছে একাধিক জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ। শুধু তা-ই নয়, রোহিঙ্গা বা বিদেশি নাগরিকরা যাতে জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের নাগরিক সেজে এনআইডি সংগ্রহ করতে না পারে, সেজন্য ইসি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।

উদাহরণ টেনে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণকারী একজন ব্যক্তি যদি ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হন এবং পরবর্তীতে আবেদন করে নিজের জন্মসাল ২০০২ করতে চান—তবে নিবন্ধনের সময় তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৩ বছর, যা আইনত অসম্ভব। এ ধরনের সাংঘর্ষিক ও নীতিবহির্ভূত আবেদন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমানে এনআইডি সংশোধনের সাধারণ আবেদনগুলো উপজেলা পর্যায়েই নিষ্পত্তি হচ্ছে। তবে নাম, পিতা-মাতার নাম বা জন্মতারিখের মতো মৌলিক ও সংবেদনশীল তথ্য একসঙ্গে পরিবর্তনের জটিল আবেদনগুলো উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। সেখানে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা ভাই-বোনদের এনআইডির তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। কোনোভাবেই শুধু হলফনামা (অ্যাফিডেভিট) দিয়ে এসব মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জমা পড়া মোট ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি সংশোধন আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকা, তথ্যের অমিল এবং একাধিক জাল কাগজপত্রের কারণে এর মধ্যে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

তবে কর্মকর্তারা জানান, বাতিলের এই সংখ্যা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মোট সংখ্যা বোঝায় না; কারণ একজন আবেদনকারী প্রয়োজনীয় কাগজের অভাবে বারবার আবেদন করায় একই আবেদন ৬ থেকে ৭ বার পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। কোনো আবেদন একাধিকবার বাতিল হলেও পরবর্তীতে সঠিক নথি উপস্থাপনের মাধ্যমে পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজের তাগিদে অনেকে শুরুতে ভুয়া জন্মতারিখ ও তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন। পরবর্তীতে তারা এনআইডি এবং পাসপোর্টের অমিল দূর করতে ইসি অফিসে এসে মা-বাবার নাম বা বয়স সংশোধনের আবেদন জানান। এতে তৈরি হয় জটিলতা।

এ বিষয়ে সিইসি বলেন, বিদেশে অবস্থানরত রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। সঠিক কাগজপত্র থাকলে দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের এনআইডি সংক্রান্ত সেবা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘ভিআইপি’ মর্যাদায় দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে জালিয়াতি প্রতিরোধ ও সৌদিসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করার স্বার্থে সব নথি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা আবশ্যক।

ইসির পরিচালকদের মতে, আবাসন পরিবর্তনের কারণে ঠিকানা বদল, বিবাহ বা বিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থা পরিবর্তন এবং ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো সাধারণ প্রক্রিয়াতেই সম্পন্ন হয়। তবে এনআইডি নিবন্ধনের সময় শুরুতেই নাগরিকদের সঠিক তথ্য প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন, যাতে পরবর্তীতে ভোগান্তি ও জালিয়াতি উভয়েই রোধ করা সম্ভব হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *