পাকিস্তানে স্কুলের ছাদধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারে একটি বেসরকারি স্কুলের জীর্ণ ভবন ভেঙে পড়ে এক মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। শহরের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় অবস্থিত ‘আল খায়ের স্কুল’-এ শ্রেণিকক্ষ চলাকালীন হুট করে ছাদ ধসে পড়লে এ পর্যন্ত ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মর্মান্তিক এই ট্র্যাজেডিতে যে ২৮ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ২৭ জনই নিষ্পাপ খুদে শিক্ষার্থী এবং একজন তাদের প্রিয় নারী শিক্ষক। এছাড়াও আরও অন্তত ১৯ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে বলে স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।

দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই পেশোয়ারের স্থানীয় জরুরি সেবা ‘রেসকিউ ১১২২’ এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে উদ্ধার কাজ শুরু করে। উদ্ধারকারী দলের মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফাইজি জানান, মাটির নিচে ও কংক্রিটের স্ল্যাবের ভেতরে আটকে থাকা স্থানগুলো থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জনকে টেনে বের করা সম্ভব হয়েছে। এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে একাধিক ব্যক্তি চাপা পড়ে থাকতে পারেন—এই আশঙ্কায় ভারি যন্ত্রপাতি ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে সতর্কতার সাথে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আহত ১৯ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম জানান, আনা আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। লেডি রিডিং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত রেড অ্যালার্ট জারি করে পুরো হাসপাতালে চিকিৎসকদের জরুরি উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়, জেলা প্রশাসনের তদারকিতে দ্রুত গতিতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে।

ঘটনার সময় ক্লাসে শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকায় তারা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময়টুকুও পায়নি। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরো আফ্রিদি আবাদ এলাকায় স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

সামিউল্লাহ নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিভাবক তার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ডনকে জানান, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে খবর পেয়ে তিনি ৯টার মধ্যেই দুর্ঘটনাস্থলে হাজির হন। তার নিজের ছয়টি সন্তান ওই স্কুলেই অধ্যয়নরত ছিল। ধসে পড়া ভবনের স্তূপ দেখে তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে তার ছেলেও হয়ত আর বেঁচে নেই। কিন্তু চরম ভয় ও মানসিক আঘাতের মধ্যেও তিনি সাহসিকতার সাথে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন এবং নিজ হাতে আট বছরের কম বয়সী তিনটি ছোট মেয়েশিশুকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অক্ষত ও জীবন্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

স্কুল ধসের এই ভয়াবহ ঘটনায় পুরো পাকিস্তানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি গভীর শোক জানিয়ে এ দুর্ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কী কারণে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ এভাবে ধসে পড়ল এবং ভবনের ফিটনেস বা নিরাপত্তা অনুমোদন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক বিবৃতিতে জানান, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে পোস্ট করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিহতদের শোকার্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, দেশের কোমলমতি শিশুরা আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, তাদের এই অকাল প্রস্থান পুরো দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদান, আহতদের সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেওয়া এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো স্কুলে এমন জরাজীর্ণ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম না চলে, সে লক্ষ্যে সারা দেশে স্কুল ভবনের নিরাপত্তা জোরদার করার শক্ত তাগিদ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *