ব্রিকস সম্মেলন: শক্তিশালী বৈশ্বিক মঞ্চে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক স্লাইড

বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সফলভাবে শেষ হলো দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। রবিবার সমাপনী দিনে জোটের মূল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি অংশীদার দেশগুলোর শীর্ষ নেতারাও এক ঐতিহাসিক মুক্ত অধিবেশনে যোগ দেন।

‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন : অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ রূপরেখা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অধিবেশনটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ ব্রিকস এখন কেবল পাঁচটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক মঞ্চে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমান বিন্যাসে জোটের মূল সদস্য হিসেবে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এর সঙ্গে নতুন সংযোজিত মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলে এখন সদস্যসংখ্যা ১১টিতে দাঁড়িয়েছে।

পাশাপাশি, এই জোটে বেলারুশ, বলিভিয়া, কাজাখস্তান, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো অংশীদার হিসেবে যুক্ত রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই জোট বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৫%, বৈশ্বিক জিডিপির ৪০% এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৬% প্রতিনিধিত্ব করছে।

শনিবার সম্মেলনের প্রথম দিনেই সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত হয়। যৌথ বিবৃতিতে ব্রিকস কার্যক্রমে অংশীদার দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ঘোষণায় বলা হয়, উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারি জোরদার করা হলে তা বৈশ্বিক সংহতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরো দৃঢ় করবে। বিশেষ করে পারস্পরিক লাভজনক এবং উন্নয়নমুখী অংশীদারি গড়ে তোলার ওপর এতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ব্রিকস নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ শীর্ষক ৪৫ পৃষ্ঠার যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছেন। এই ঘোষণাপত্রে গ্লোবল সাউথের ভূমিকা বাড়ানো ও অর্থবহ করার আহবান জানানো হয়েছে। ঘোষণাপত্রে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ডলারের বিকল্প নিয়ে বাস্তবসম্মত অবস্থান : ব্রিকসের নিজস্ব মুদ্রা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে দিল্লি সম্মেলনে এখনই একটি পৃথক ব্রিকস মুদ্রা চালুর সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি। বরং স্থানীয় মুদ্রায় সীমান্ত-পারাপার বাণিজ্য এবং অর্থ প্রদানের ব্যবস্থাকে আরো সহজ করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গতকাল সম্মেলনের শেষ দিনের আলোচনায় ব্রিকস প্লাস ও আউটরিচ বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে  ব্রিকসের সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। সম্মেলনের শেষে সবচেয়ে বড় বার্তা ছিল এটাই—বিশ্ব রাজনীতিতে মতপার্থক্য যতই থাকুক, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার একটি অভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ও বাণিজ্যিক চাপের মতো কঠিন প্রশ্নে ব্রিকস নিজেদের যৌথ অবস্থান স্পষ্ট করেছে। চলতি বছরের  ব্রিকস সম্মেলন শেষ হওয়ার পর আগামী বছর যথানিয়মে সভাপতিত্ব যাবে চীনের হাতে।

সূত্র : আনাদোলু, এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *