বেসরকারি খাতে ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি

অর্থনীতি স্লাইড

দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত জুনে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৪৭ শতাংশে।

বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানিসংকট ও ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঋণপ্রবাহের এ নিম্নগতি বেসরকারি অর্থনীতির সংকট আরো স্পষ্ট করেছে। উৎপাদন ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৯৮ শতাংশ।

জুনে তা কমে ৪.৪৭ শতাংশে নেমে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ শতাংশ।

ঋণপ্রবাহের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনেও মন্থরতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ দাঁড়িয়েছে ২১.৫৩ শতাংশ, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২.৮৬ শতাংশে নেমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮.১৮ শতাংশ।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডের সূচক পিএমআই কমে ৪৮.৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে এ সূচক ছিল ৪৯.৯।

টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সূচকটি। উৎপাদন খাতের সূচকও ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮-এ নেমেছে।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া ও উৎপাদনে স্থবিরতা অর্থনীতির জন্য ভালো খবর নয়। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদন আরো কমতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগের আগ্রহও কমেছে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গতিশীল নেই। প্রতিকূল পরিবেশে নতুন বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছেন। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি না বাড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও সীমিত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ব্যয় ও নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো না গেলে বেসরকারি খাতের সংকট আরো গভীর হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *