কর আদায়ে বড় পরিবর্তনের পথে এনবিআর

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে দীর্ঘমেযাদী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে সরকারি ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে রাজস্ব আহরণের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এনবিআরের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ ও তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই অনুপাত দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৮ শতাংশে। প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা প্রসারিত করা, আধুনিক প্রযুক্তির বহুল ব্যবহার, ডিজিটাল রূপান্তর, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জনের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের এই সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব বাড়ানোর বিস্তারিত কৌশলগত ব্লুপ্রিন্ট উপস্থাপন করা হয়। দেশের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করতে এই উদ্যোগকে এখন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক চিত্র ও কর-জিডিপি ঘাটতির পটভূমি

গত দুই দশকের বেশি সময়ের রাজস্ব উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এনবিআর দেখেছে যে, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘস্থায়ীভাবে একটি সীমিত গণ্ডির মধ্যে আটকে আছে। গত ২৫ বছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ সময়ই এই অনুপাত ছিল ৭ থেকে ৮ শতাংশের ঘরে। কেবল ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যবর্তী সময়ে এটি সাময়িকভাবে প্রায় ১০ শতাংশে উন্নীত হতে পেরেছিল। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি এবং অনুপাত পুনরায় হ্রাস পেতে শুরু করে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে:

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়ায় ৬.৭ শতাংশে।
  • ২০২৫-২৬ অর্থবছর: এটি সামান্য বেড়ে ৬.৮ শতাংশে অবস্থান করছে।

একই পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৫ বছরে সরকারের সার্বিক ব্যয় ৪.৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে ৩.৪০ গুণ। অর্থাৎ, সরকারের বাজেট ও উন্নয়ন ব্যয়ের যে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে, রাজস্ব আহরণের গতি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩.৪৩ শতাংশ। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সংস্থান করতে হলে এই প্রবৃদ্ধির হার বহুগুণ বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এনবিআর বর্তমানে সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে, ফলে সার্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রাজস্ব বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।

সময়ের ফ্রেম অনুযায়ী কর-জিডিপি উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা

রাজস্ব আহরণের এ ঘাটতি দূর করতে এনবিআর তিন ধাপের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছে:

সময়কাল কর-জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য
স্বল্পমেয়াদ ৮.৮% করদাতা সেবা বৃদ্ধি, এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সংস্কার এবং প্রারম্ভিক অটোমেশন।
মধ্যমেয়াদ ১০.০% ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামোর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত করদাতা ডেটাবেজ চালু।
দীর্ঘমেয়াদ (২০৩৫) ১৫.০% রিয়েল-টাইম কর পরিপালন বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ও উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর রাজস্ব প্রশাসন।

‘ওয়ান এনবিআর’ ও প্রশাসনিক সমন্বয়

এনবিআরের প্রস্তাবিত সংস্কারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘ওয়ান এনবিআর’ (One NBR) ধারণার বাস্তবায়ন। বর্তমানে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস—এই তিনটি প্রধান বিভাগ পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে নিজ নিজ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে করদাতাদের তথ্য শেয়ারিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়।

‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামোর অধীনে বিভাগগুলোর পৃথক কাজের সংস্কৃতি বন্ধ করে একটি সমন্বিত করদাতা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। এর সুফলসমূহ:

  • একীভূত তথ্যভান্ডার: একজন করদাতার আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য একটি একক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে।
  • সমন্বিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: কর ফাঁকি বা তথ্য গোপন করার প্রবণতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
  • বকেয়া রাজস্ব আদায়: বকেয়া করের তথ্য ও কর পরিশোধের প্রক্রিয়া এক ছাতার নিচে আসায় তদারকি সহজ হবে।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা

মহাপরিকল্পনাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রাথমিক ৩ বছর এবং পরবর্তী ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য পৃথক রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।

১. প্রথম ৩ বছরের প্রাথমিক পদক্ষেপ

  • স্বতন্ত্র মাস্টার ডেটাবেজ ও সিস্টেমে সমন্বয়: প্রতিটি করদাতার জন্য একটি অনন্য বা স্বতন্ত্র মাস্টার ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি একটি অভিন্ন ‘ডেটা ডিকশনারি’ ও ‘সিস্টেম ইনভেন্টরি’ গড়ে তোলা হবে।
  • সমন্বিত অ্যাকাউন্ট ও কেস ম্যানেজমেন্ট: গ্রাহক সেবা ও মামলা পরিচালনার জন্য একীভূত প্ল্যাটফর্ম চালু এবং সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট প্রস্তুত করা।
  • তৃতীয় পক্ষের ডেটা যাচাই: ব্যাংক, নিবন্ধক ও অন্যান্য সংস্থার মতো তৃতীয় পক্ষের উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে করদাতার দাখিল করা তথ্য মিলিয়ে দেখার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা।
  • রাজস্ব নীতি সচিবালয় ও নীতি সংস্কার: নীতি প্রণয়নের সক্ষমতা বাড়াতে পৃথক রাজস্ব নীতি সচিবালয় গঠন করা হবে। কোনো কর সুবিধা বা নীতি পরিবর্তনের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব মূল্যায়নের জন্য বাধ্যতামূলক টেমপ্লেট চালুর পাশাপাশি ‘কর-ব্যয়ের রেজিস্টার’ (Tax Expenditure Register) প্রস্তুত করা হবে।
  • কাস্টমস ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা: সীমান্ত সংক্রান্ত বিশেষায়িত কার্যক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে আমদানি-রপ্তানিকারকদের তথ্যের সঙ্গে পণ্যের অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যায়ন, আয়কর ও ভ্যাটের ঝুঁকি সম্পর্কিত উপাত্তের সমন্বয় সাধন।

২. পরবর্তী ৩ থেকে ৫ বছরের উন্নত অটোমেশন

  • রিয়েল-টাইম অ্যানালিটিক্স: প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কর পরিপালন ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত অ্যানালিটিক্স ব্যবস্থা চালুকরণ।
  • প্রাক-পূরণকৃত কর রিটার্ন (Pre-filled Tax Returns): আইনি বাধ্যবাধকতা পর্যালোচনা করে যোগ্য করদাতাদের জন্য আগে থেকেই তথ্য পূরণ করা রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
  • স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ও জালিয়াতি শনাক্তকরণ: কম ঝুঁকিপূর্ণ করদাতাদের অতিরিক্ত পরিশোধিত কর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরতের (Auto-refund) ব্যবস্থা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে সংঘবদ্ধ কর জালিয়াতি ধরে ফেলার আধুনিক পদ্ধতি প্রবর্তন।

কর অব্যাহতি, শিল্পবান্ধব নীতি ও অগ্রাধিকার খাতসমূহ

এনবিআরের কৌশলপত্রে কেবল কর আদায় বাড়ানোর ওপরই জোর দেওয়া হয়নি, বরং দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়েও ভারসাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এনবিআর জানিয়েছে, ঢালাওভাবে কর বাড়ানোর বদলে করের ভিত্তি বড় করা হবে।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সহায়তা অব্যাহত বা পুনর্গঠন করা হবে:

  • উৎপাদন ও শিল্প খাত: কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কের হার যুক্তিযুক্তকরণ ও কমানো।
  • কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃষি উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রদান।
  • প্রযুক্তি ও বিকাশমান শিল্প: তথ্যপ্রযুক্তি (IT), মোবাইল ফোন অ্যাসেম্বলি, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) শিল্পে বিশেষ কর ছাড়।
  • সামাজিক ও সবুজ খাত: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME), স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পুঁজিবাজারে বিকাশবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রয়োগ।
  • সেবা সহজীকরণ: কাস্টমস অটোমেশন নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বিত সুবিধা দিতে ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ (NSW) দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা।

এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, কৌশলগতভাবে তথ্যপ্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের এই মিশ্রণ বাস্তবায়িত হলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাতের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *