দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস পণ্য রপ্তানি খাতে আবার সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। শীর্ষ তিন খাতের শক্ত ভিত্তির ওপর ভর করে সদ্য সমাপ্ত অক্টোবরে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে সামগ্রিক বাণিজ্য। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশ করা হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে পণ্য রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৩৯ শতাংশ বেড়েছে।
অক্টোবরের সার্বিক বাণিজ্য চিত্র ইপিবির প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৯৯ কোটি (৩.৯৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। বিগত অর্থবছরের (২০২৫) অক্টোবর মাসে এই আয় ছিল ৩৯৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেবল অক্টোবর মাসেই রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৫ কোটি ডলার।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বৈশ্বিক টানাপোড়েনের মধ্যেও দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলো আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং পাট খাতের সম্মিলিত প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক ঋণাত্মক প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
চলতি অর্থবছরের চার মাসের ধারাবাহিকতা কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসেই নয়, বরং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেও (জুলাই থেকে অক্টোবর) সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে সুসংবাদ এসেছে। তথ্যে দেখা যায়, গত চার মাসে দেশ থেকে মোট ১ হাজার ৭০৯ কোটি (১৭.০৯ বিলিয়ন) ডলার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
বিগত অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-অক্টোবর) মোট পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬১৪ কোটি ডলার। এর অর্থ হলো, গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৯৪ কোটি ৮৯ লাখ ডলার বা ৫.৮৮ শতাংশ। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি নির্দেশক।
তৈরি পোশাক খাতের অগ্রযাত্রা প্রতিবারের মতোই দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ এসেছে প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও মজবুত হচ্ছে।
- আয় ও প্রবৃদ্ধি: গত অক্টোবরে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় এসেছে প্রায় ৩১৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের অক্টোবরে ছিল ৩০২ কোটি ডলার।
- প্রবৃদ্ধির হার: এক বছরের ব্যবধানে একক এই খাতে আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।
- অনুকূল পরিবেশ: বিশ্ববাজারের নানামুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিদেশি ক্রেতাদের টানা আস্থা এবং অর্ডার বৃদ্ধির ফলেই তৈরি পোশাক খাতে এই শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে।
চামড়া ও পাট খাতের প্রশংসনীয় ঘুরে দাঁড়ানো শীর্ষ পাঁচ খাতের মধ্যে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চমক দেখিয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং পাট ও পাটজাত পণ্য খাত।
- পাট ও পাটজাত পণ্য: অক্টোবরে পরিবেশবান্ধব এই খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে প্রায় ৯ কোটি ডলার। গত বছরের একই মাসে এই আয়ের পরিমাণ ছিল আরও কম। ফলে বছর ব্যবধানে পাট খাতে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৯.৫ শতাংশ।
- চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য: একই সময়ে চামড়া খাত থেকে অর্জিত হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ডলার। গত বছরের অক্টোবরে যা ছিল ৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। সে হিসাবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ৪.৭০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নথিভুক্ত হয়েছে।
সংকটে কৃষি প্রক্রিয়াজাত ও হোমটেক্সটাইল খাত সামগ্রিক চিত্র ইতিবাচক হলেও দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে রপ্তানির পতন বাণিজ্য বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হোমটেক্সটাইল খাতের ঋণাত্মক ধারা এখনো কাটেনি।
- কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য: টানা তিন মাস ধরে এ খাতে পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে যেখানে এ খাত থেকে আয় এসেছিল ১০ কোটি ২৩ লাখ ডলার, সেখানে সদ্য সমাপ্ত অক্টোবরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ কোটি ডলারে। এতে করে খাতটিতে বছর ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
- হোমটেক্সটাইল: গৃহস্থালি টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানিও সংকুচিত হয়েছে। অক্টোবরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের সোয়া ৭ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ৩.৭৫ শতাংশ কম।
অন্যান্য খাতের মিশ্র পারফরম্যান্স শীর্ষ খাতের বাইরেও বেশ কিছু সম্ভাবনাময় পণ্যের বিচিত্র গতিধারা দেখা গেছে গত মাসে:
- হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ: এ খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। গত অক্টোবরে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি আয়ে ১৩ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে।
- কাঁকড়া রপ্তানি: বিপরীতে কাঁকড়া রপ্তানিতে অভূতপূর্ব উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। খাতটিতে এক লাফেই ৮১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
- রাসায়নিক ও ওষুধ: শিল্প খাতের মধ্যে রাসায়নিক পণ্য থেকে অর্জিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি ডলার (প্রবৃদ্ধি ১৯.৫ শতাংশ)। একই সঙ্গে লাইফ-সেভিং ওষুধ ও ফার্মা সামগ্রী রপ্তানিতে ২৬ শতাংশের কাছাকাছি চমৎকার প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মন্দা ভাব সত্ত্বেও তৈরি পোশাক, চামড়া ও ওষুধের মতো প্রধান প্রধান খাতের চাঙ্গা ভাবের কারণে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারের চাহিদা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে মোট রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।
