পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ নৃতাত্ত্বিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর প্রাণ বাঁচাতে প্রতিবেশী কেনিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। বাস্তুচ্যুত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বড় অংশই চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো নারী ও শিশু। বুধবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে এ উদ্বেগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংঘাতের মূল সূত্রপাত হয় ইথিওপিয়ার সোমালি ও ওরোমিয়া অঞ্চলের যৌথ শাসনাধীন সীমান্ত শহর ‘মোয়ালে’-তে। গত ২০ অক্টোবর শহরটিতে সোমালি অঞ্চলের পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দুই অঞ্চলের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে চরম উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সূচনা হয়। পতাকা কেন্দ্রিক এই রাজনৈতিক বিরোধ দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংহিসতায় রূপ নেয়। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত চলমান এই তীব্র সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের (UNHCR) দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতি কতটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে কেনিয়ায় প্রবেশ করা বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩৬ হাজার। তবে সোমালি ও ওরোমিয়া অঞ্চলের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে মাত্র একদিনের ব্যবধানেই এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
কেনিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার প্রধান প্রতিনিধি ফাতিমা মোহাম্মদ-কোল মানবিক সংকট গভীর হওয়ার কথা জানিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মুহূর্তের মধ্যে নতুন নতুন এলাকা সংঘাতের কবলে পড়ছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে এখনো হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত কেনিয়ার দিকে ভিড় করছেন। এর ফলে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা সরকারি হিসেবকেও ছাড়িয়ে গিয়ে আরো অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বর্তমানে ইথিওপিয়া থেকে আসা ভিটেমাটিহীন এসব মানুষ চরম মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন। আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ স্থানীয় বাসিন্দা ও পূর্ব পরিচিত আত্মীয়স্বজনদের বাসায় সাময়িকভাবে উঠেছেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকেই থাকতে হচ্ছে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে। তারা মূলত স্থানীয় বিভিন্ন বিদ্যালয়, গির্জা এবং খোলা আকাশের নিচে প্রস্তুত করা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে কোনোমতে মাথা গুঁজে আছেন।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে তৎপরতা শুরু করেছে জাতিসংঘ। ইউএনএইচসিআর সীমান্ত এলাকায় দ্রুত একটি বিশেষ জরুরি দল (Emergency Team) পাঠিয়েছে। কেনিয়া সরকার, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস এবং অন্যান্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য জরুরি খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
প্রায় ১৩ কোটি মানুষের জনসংখ্যাসমৃদ্ধ ইথিওপিয়া আফ্রিকার দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। তবে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দেশটি দীর্ঘ দিন ধরেই অভ্যন্তরীণ নানা সংঘাতের শিকার। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত ও নির্ধারিত বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসনিক সীমানা নিয়ে দেশটির নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চরম বিরোধ চলে আসছে। এই অনিষ্পন্ন সীমান্ত এলাকাগুলোই বারবার দেশের সহিংস সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
বর্তমানে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কয়েক বছর ধরেই দেশটির সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দুই অঞ্চল—ওরোমিয়া এবং আমহারায় সক্রিয় নানা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক সশস্ত্র লড়াই চলছে। এর পাশাপাশি, উত্তরাঞ্চলীয় ‘তিগ্রাই’ অঞ্চলে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে আবারও সামরিক উত্তেজনা ও সামরিক লড়াই শুরু হয়েছে।
একদিকে অভ্যন্তরীণ এই বহুমুখী সংঘাত, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার নতুন করে তৈরি হওয়া তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নতুন এক আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোয়ালের এই সাম্প্রতিক সংঘাত ইথিওপিয়ার গভীরতর রাজনৈতিক বিভাজন ও ভঙ্গুর নিরাপত্তারই প্রকাশ।
