সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা নির্ধারণ এবং পুনর্নির্ধারণের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত এসব জনবলের বেতন-ভাতা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা স্পষ্ট করে একটি নতুন ও যুগোপযোগী প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এই আদেশ জারি করা হয়। নতুন এই নীতিমালায় ২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের আগের এবং পরের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব শরীফ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিগত ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি জারি করা পুরনো প্রজ্ঞাপনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই নীতিমালাটি কার্যকর হবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। এর ফলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে নতুন বিন্যাস আসছে।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের আগে যারা জাতীয় বেতন স্কেল-এর আওতাধীন বিভিন্ন গ্রেডে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন এবং যাদের চুক্তির মেয়াদ উক্ত তারিখের পরেও বলবৎ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়মের মুখোমুখি হতে হবে।
এসব কর্মচারীর পূর্বের চুক্তি সংশোধন সাপেক্ষে নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী তাদের বেতন নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সংশ্লিষ্ট গ্রেড ও ধাপ অনুযায়ী তাদের মূল বেতন পুনর্নির্ধারিত হবে। এছাড়া চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী তারা বর্ধিত হারে বেতন পাওয়ার অধিকারী হবেন। তবে এই সুবিধাগুলোর ক্ষেত্রে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের বিষয়টি এই ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য যে সমস্ত ভাতা পাওয়ার কথা রয়েছে, তা নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত প্রদান করা হবে।
অন্যদিকে, যারা ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের পরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন কিংবা ভবিষ্যতে পাবেন, তাদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।
এই ক্যাটাগরির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তারা সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার ঠিক অব্যবহিত পূর্বে জাতীয় বেতন স্কেলের যে গ্রেড এবং ধাপে মূল বেতন পেতেন, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে। নতুন বেতন স্কেলে সেই নির্দিষ্ট গ্রেড ও ধাপের বেতনকে ভিত্তি ধরে তাদের চুক্তিভিত্তিক পদের মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে। যদি এই ক্ষেত্রে পূর্বে কোনো বিদ্যমান চুক্তি থেকে থাকে, তবে তা অবশ্যই সংশোধন করে নিতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তিভিত্তিক পদে যোগদানের তারিখ থেকে নির্ধারিত বিধান অনুসারে তারা বর্ধিত হারে বেতন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা পাবেন। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বেতন অথবা সরকার ও নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তিতে যে বেতন নির্ধারিত হবে, সেটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হবে।
নতুন এই প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সঙ্গে জড়িত পেনশন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিষয়েও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নির্ধারিত বেতন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোট পেনশন—যা কম্যুটেশন বা সমর্পণের আগের অঙ্ক হিসেবে বিবেচিত—এবং কোনো বিশেষ অতিরিক্ত পেনশন থাকলে তা কোনোভাবেই বাদ দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, পেনশনের হিসাবের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক বেতনের কোনো নেতিবাচক সমন্বয় করা হবে না।
তবে প্রজ্ঞাপনে অত্যন্ত কঠোরভাবে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকালীন চাকরির মেয়াদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো ধরনের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট পাবেন না। এছাড়া এই চুক্তিভিত্তিক মেয়াদের জন্য কোনো আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) কিংবা বর্ধিত পেনশনও দেওয়া হবে না বলে প্রজ্ঞাপনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে চুক্তিভিত্তিক প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন শৃঙ্খলা আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
