রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ২৯ দেশের নাগরিক

আন্তর্জাতিক স্লাইড

দারিদ্র্য দূর করার আকুল আকুতি, উন্নত জীবনের স্বপ্ন আর রুশ রুবলে সংসারের অভাব ঘোচানোর অলীক আশ্বাস—এমন হাজারো বর্ণিল স্বপ্নের ফ্রেমে পা বেঁধে দূরপ্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন বহু অসহায় মানুষ। পরিবারের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অনেকেই ছুটে গিয়েছিলেন রাশিয়ার মাটিতে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই কেটে গেছে সব মোহ; স্বপ্নের রঙিন আলো নিভে শুরু হয়েছে এক বিভীষিকাময় বাস্তবতা। কর্মসংস্থানের বদলে তাদের হাতে জোরপূর্বক তুলে দেওয়া হয়েছে প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র, ঠেলে দেওয়া হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অতল গহ্বরে।

শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিকরাই নন, বিশ্বের অন্তত ২৯টি দেশের অসহায় মানুষকে চাকরির ফাঁদে ফেলে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়েছে বিভিন্ন পাচারকারী চক্র ও রুশ বাহিনী। সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই লোমহর্ষক ও আশঙ্কাজনক চিত্র।

জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক তদন্ত কমিশন মোট ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনে অত্যন্ত জোরালো প্রমাণসহ উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা সক্রিয় মানব পাচারকারী এজেন্টদের সরাসরি সহায়তায় এবং রুশ কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ ইন্ধনে এই বৃহৎ আকারের মানব পাচারের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রতারণামূলক কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন ও উজবেকিস্তানসহ মোট ২৯টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। পাচারের শিকার এই ভুক্তভোগী মানুষদের সকলেরই বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে রাশিয়া কীভাবে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে, তারও সবিস্তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে রাশিয়ায় প্রবেশের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত বেশ কিছু বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়ী ভিসার (Business Visa) নথি সংগৃহীত হয়েছে তদন্ত কমিশনের হাতে। বাহ্যিকভাবে ভিসাগুলোতে রাশিয়ার একটি বেসরকারি কোম্পানির আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ ছিল এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য হিসেবে ‘বেসামরিক’ কর্মকাণ্ডের কথা লেখা থাকত। কিন্তু মূলত এই বেসামরিক ভিসার আড়ালেই চলত রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে জনবল সরবরাহের এক গভীর চক্রান্ত।

সোশ্যাল মিডিয়া ও অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তরুণদের সিকিউরিটি গার্ড, ড্রাইভার, কনস্ট্রাকশন কর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা ক্লিনার হিসেবে চড়া বেতনের প্রলোভন দেখানো হতো। কিন্তু প্রবাসীরা রাশিয়ার মাটিতে পা রাখা মাত্রই তাদের পাসপোর্ট, মোবাইল ফোনসহ যাবতীয় ব্যক্তিগত নথিপত্র জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হতো। এরপর রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিপত্রে চাপ সৃষ্টি করে স্বাক্ষর আদায় করা হতো, যার ভাষা বা মর্মার্থ ভুক্তভোগীরা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারতেন না।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী এক বাংলাদেশির স্ত্রী অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, “আমার স্বামী রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তিপত্রের বিভিন্ন জায়গায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। তীব্র চাপ ও ভীতি প্রদর্শনের মুখে পড়ে তার সামনে আর কোনো উপায় খোলা ছিল না।”

রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়ে বর্তমানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দি হিসেবে দিন কাটাচ্ছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ২৭ বছর বয়সী যুবক রিমেল মিয়া। তার জীবনের গল্পটি এই চক্রের শিকার হওয়া প্রতিটি তরুণের এক করুণ দলিল।

পরিবারের অভাব মেটাতে ও ভালো চাকরির আশায় প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২৫ সালের মার্চে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন রিমেল। কথা ছিল তিনি একটি নির্মাণ সংস্থায় স্থায়ী কাজ পাবেন। তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি তার কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি; উল্টো মুখোমুখি হন চরম আইনি ও অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতার। কোনো উপায় না দেখে এবং পরিস্থিতির নির্মম শিকার হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হন।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনের রণক্ষেত্রের একদম সামনের সারিতে (Frontline) মোতায়েন থাকা অবস্থায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন রিমেল। সেই থেকে তিনি ইউক্রেনের একটি শিবিরে যুদ্ধবন্দি হিসেবে দিন কাটাচ্ছেন এবং তার পরিবার প্রহর গুনছে এক চরম অনিশ্চয়তার।

জাতিসংঘের এই বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে এবং নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *