এবার ফ্রান্সজুড়ে ‘জেন জি’ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক স্লাইড

২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে বড় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। একই বছর কেনিয়ায় কর বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি ব্যয়ের প্রতিবাদে তরুণরা বিক্ষোভে নামে।

পুলিশি সহিংসতা ওই আন্দোলনকে আরো তীব্র করে।

তিউনেশিয়ায় ২০২৫-২০২৬ সালে বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল সরকারি সেবা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিক্ষোভ হয়। সার্বিয়ায় ২০২৪ সালে রেলস্টেশনের ছাদ ধসে প্রাণহানির পর দুর্নীতি ও সরকারি অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে।

নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে তরুণরা বিক্ষোভ করে।

ইন্দোনেশিয়ায় কর বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ-পানি সংকট ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে তরুণরা রাজপথে নামে। মরক্কোয় বেকারত্ব, দুর্বল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ হয়।

তুরস্কে নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তরুণদের আন্দোলন দেখা যায়।

পেরু ও মেক্সিকোয় অপরাধ, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তরুণরা আন্দোলনে নামে।
এবার সেই জেন-জি বিক্ষোভ এবার ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সে। দেশটিতে শিক্ষক, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ও শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। পরে তা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনায় রূপ নিয়েছে।

 দেশভেদে দাবিগুলো আলাদা হলেও এসব আন্দোলনে মিল রয়েছে, দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এসব আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ফ্রান্সে জেন-জি বিক্ষোভ

ফ্রান্সে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে সহিংস রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতির কারণে দেশজুড়ে ৫০০টির বেশি স্কুল বন্ধ রয়েছে। আন্দোলন শুরুর পর প্রায় ৫ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, স্কুলকর্মী ও পুলিশ সদস্যসহ বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর সংকট, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ও শিক্ষা খাতে অর্থের ঘাটতির কারণে তারা বিক্ষোভে নেমেছেন। বিভিন্ন এলাকায় স্কুল অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

গত ১৮ দিনে অন্তত ২৪টি স্কুল ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, সরকার এখনো তাদের সমস্যার সমাধানে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা কেন প্রতিবাদ করছে?

ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ থেকেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছে। তাদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো স্কুলগুলোতে শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতি।  দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১০ শতাংশ ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ক্লাস বন্ধ ছিল বিকল্প শিক্ষক না পাওয়ার কারণে। এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা ও শিক্ষক সংকট সমাধানের দাবি জানাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতির পাশাপাশি স্কুলগুলোতে প্রয়োজনীয় উপকরণ, অর্থায়ন ও অবকাঠামোরও সংকট রয়েছে। তাদের দাবি, অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত ডেস্ক-চেয়ার নেই, নার্স ও তত্ত্বাবধায়কও কম।

প্যারিসের উপশহর পান্তিনের এক ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রতি শ্রেণিতে প্রায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার নেই।’ অন্যদিকে, স্ট্রাসবার্গের ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী জানান, গরমের সময় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে শ্রেণিকক্ষে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই, কোথাও ভবন থেকে পানি চুইয়ে পড়ে এবং ক্যাফেটেরিয়াও প্রয়োজনের তুলনায় ছোট।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এসব সমস্যার পাশাপাশি স্কুলগুলোর বাজেট ও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতিও দীর্ঘদিনের। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত অর্থ ও কর্মী না থাকায় শিক্ষা পরিবেশ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে তীব্র গরমের সময় স্কুলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও রয়েছে। ১৯ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, উপযুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করতে না পারায় তারা ক্ষুব্ধ। তার মতে, শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন হলেও সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসাপ’ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। তাদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের নির্দিষ্ট অভিযোগ এক নয়। কোথাও শিক্ষক ও কর্মী সংকট, কোথাও স্কুলের অবকাঠামো ও অর্থের অভাব, আবার কোথাও গরমের মধ্যে শিক্ষার পরিবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, আন্দোলনের মূল কারণ নির্ধারণ ও সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ বিক্ষোভকারীদের কোনো একক জাতীয় দাবি নেই। শুক্রবার সকালে তিনি জানান, বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সমস্যা থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। ফলে অঞ্চলভেদে শিক্ষার্থীদের দাবিও ভিন্ন।

বিক্ষোভের শুরু ও বিস্তার

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের লিসে সাঁ-একজুপেরি স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের শুরু। শিক্ষক সংকট ও স্কুলে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই প্যারিসসহ ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেশের বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ শুরু হয়।

পশ্চিমে রেন, নান্তেস, কিম্পার ও ব্রেস্ট, দক্ষিণে বোর্দো, তুলুজ, তুলোঁ, মার্সেই ও গ্রেনোবল, পূর্বে স্ট্রাসবুর্গ এবং উত্তরে লিল শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ১৮০টি স্কুলের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও সপ্তাহের শেষে এ সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। আন্দোলনের মধ্যে কয়েকটি স্কুলে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। মার্সেইয়ের দুটি স্কুলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় একটি দমকলের গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

দুটি ছাত্র সংগঠন আগামী সপ্তাহেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, বাজেট কমানো, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধের মতো সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

ফরাসি কর্মকর্তারা যা বলছেন

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দিন দিন তীব্র ও বিস্তৃত হওয়ায় দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের প্রতিও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সংলাপের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সহিংসতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন বলেন, যেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের অভিভাবকদের ক্ষতিপূরণের দায় নিতে হতে পারে।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অভিভাবকদের সন্তানদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সহিংস পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের রাস্তায় থাকা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু বৃহস্পতিবার জরুরি বৈঠক ডাকেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকজন মন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত সফরও বাতিল করা হয়।

এদিকে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেন, তরুণদের উদ্বেগ ও ক্ষোভের বিষয়টি তিনি বুঝতে পারছেন। তবে এসব উদ্বেগ বা ক্ষোভ কোনোভাবেই সহিংসতার কারণ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *