চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর পেছনে আবহাওয়ার পরিবর্তন, মশার অতিরিক্ত ঘনত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ঘাটতি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। আগস্ট থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। যা আগামী অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রকোপ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রোগতত্ত্ববিদদের পূর্বাভাস বলছে—চলতি বছর ডেঙ্গু আরো বাড়বে। প্রতি চার বছর পর পর ডেঙ্গুর মহামারি ঘটে, ২০২৩ সালে সর্বশেষ ডেঙ্গুর মহামারি হয়েছিল। এ বছরের শেষের দিকে সেটা আবারও হতে পারে। কাজেই আমরা যদি মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগী ব্যবস্থাপনার পলিসি না বদলাই তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খুব একটা উন্নত হবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সাত দিনে ৮ হাজার ৫৭ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর পরিসংখ্যানও ঊর্ধ্বমুখী। সেপ্টেম্বর মাসের সাত দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। যেখানে আগস্ট মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের; আর আক্রান্ত ছিল ২০ হাজার ৫৩৬ জন। এর পরের অবস্থানে ছিল জুলাই মাসে, আক্রান্ত ৯ হাজার ২০৬ জন এবং মৃৃত্যু ৩৬।
এদিকে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিপজ্জনক রূপ নিয়ে সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এই ধাক্কা সামলাতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, ‘অক্টোবরে ডেঙ্গুর বড় ধাক্কা সামলাতে এখনই নামতে হবে। এই সম্ভাব্য মহামারি ঠেকাতে এখন থেকেই সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থল ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি দেশ জুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গত রবিবার জাতীয় সংসদের জেনারেল ওসমানী গেটে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ আশঙ্কার কথা জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে কেবল গতানুগতিক ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া ছিটানোর পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে লার্ভা ধ্বংস করার সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ডেঙ্গু এখন আর কেবল রাজধানী ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যাতায়াত ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের কারণে এটি দ্রুত দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া জনসচেতনতার অভাব ও দেরিতে চিকিত্সা নিতে আসাও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগী নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। দরকার মশা নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায় পর্যান্ত কাজ করা। কমিউনিটি পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা ব্যবস্থা করতে হবে।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নতুন সেরোটাইপ : ২০২৬ সালের পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয়ও বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করছে—ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপের পরিবর্তন। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে দেশে ডেন-৩-এর উপস্থিতি বেড়েছে বলে উঠে এসেছে। ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া গেছে। এক জন ব্যক্তি আগে এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলেই গুরুতর রোগ হবে—এমন সরল সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
প্রেভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গুকে থামাতে বা প্রতিরোধ করতে হলে ডেঙ্গুর যে বাহক এডিস মশাকে মারতে হবে বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেন্দ্রিয়ভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। মশার বাসস্থান, কেন্দ্র এবং উড়ন্ত মশা, প্রাপ্তবয়স্ক মশা এবং লার্ভা মারার জন্য একটি কার্যকর ওষুধ ছিটাতে হবে। মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য যে ওষুধ ছিটানো হয়, সে রকম না।
২৪ ঘণ্টায় আরো চার মৃত্যু : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো চার জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩১৪ জন। তাদের মধ্যে ৮৫১ জন পুরুষ ও ৪৬৩ জন নারী। রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার সময়ের তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মোট ১২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৮ জন নারী ও ৫৩ জন পুরুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হওয়া ৪ জনের মধ্যে তিন জনই নারী ও এক জন পুরুষ। সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জনে।
