ঋণখেলাপি ও করফাঁকি দিয়ে মিলবে না ‘সেরা করদাতা’র স্বীকৃতি

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ অবদান রাখা করদাতাদের উৎসাহিত করতে সরকার নতুন ‘সেরা করদাতা সম্মাননা প্রদান নীতিমালা, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত এই নতুন নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো রাজস্ব নীতিতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, এবং একই সঙ্গে সর্বস্তরের নাগরিকদের নিয়মিত ও সঠিকভাবে আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা। তবে পূর্বের তুলনায় এবারের নীতিমালায় যোগ্যতার শর্তাবলি অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, মানি লন্ডারিং কিংবা ব্যাংক ঋণের খেলাপিদের এই জাতীয় সম্মাননার আওতার বাইরে রাখার জন্য নীতিমালায় কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

অযোগ্যতার কঠোর মানদণ্ড ও সরকারি সংস্থার নজরদারি

নতুন নীতিমালার অন্যতম প্রধান দিক হলো করদাতার আর্থিক ও আইনি পরিচ্ছন্নতা যাচাই করা। কোনো ব্যক্তির নামে বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার তদন্তে যদি কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং, আন্তর্জাতিক অপরাধ, অর্থ আত্মসাৎ বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ বা সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তাকে সেরা করদাতা সম্মাননার জন্য বিবেচনা করা হবে না।

এ ছাড়া, দেশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করা খেলাপি ঋণগ্রহীতারাও সেরা করদাতার তালিকা থেকে সরাসরি বাদ পড়বেন।

করসংক্রান্ত নিজস্ব আইনি বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে কঠোর শর্ত। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী:

  • নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন ও প্রয়োজনীয় বিবরণী দাখিল না করা,
  • আয়কর বা দানকর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা কিংবা পুনর্নিরীক্ষিত মামলা চলমান থাকা,
  • অতিরিক্ত বকেয়া কর থাকা বা কর পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া,
  • আন্তর্জাতিক লেনদেনকারী কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরমে ‘আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পর্কিত বিবরণী’ দাখিল না করা— এসবের যেকোনো একটি কারণে সংশ্লিষ্ট করদাতা বা প্রতিষ্ঠান এই সম্মাননা পাওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। পাশাপাশি সেরা করদাতা হিসেবে বিবেচিত হতে হলে সংশ্লিষ্ট করদাতার কর সংক্রান্ত কার্যক্রম কমপক্ষে বিগত দুই বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ও নিয়মিত থাকতে হবে।

সম্মাননার সংখ্যা ও ক্যাটাগরি বিস্তার

চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, কর প্রদানে উৎসাহ সৃষ্টি ও করদাতাদের সামাজিকভাবে সম্মানিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। নীতিমালার খসড়া পর্যায়ে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ কর প্রদানকারীসহ মোট ৬৭ জনকে সম্মাননা দেওয়ার কথা আলোচনা হলেও, চূড়ান্ত ‘সেরা করদাতা সম্মাননা প্রদান নীতিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী মোট ৭২ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই সেরা করদাতা সম্মাননা প্রদান করা হবে।

সম্মাননা প্রাপ্তদের তালিকা প্রধানত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: ১. ব্যক্তি পর্যায়: ৩৩ জন ২. কোম্পানি পর্যায়: ১৫টি প্রতিষ্ঠান ৩. বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাত: ২৪টি কোম্পানি

১. ব্যক্তি ও বিশেষ শ্রেণি (২৪ জন)

ব্যক্তি পর্যায়ের ৩৩টির মধ্যে বিশেষ শ্রেণিতে মোট ২৪ জন করদাতাকে সম্মাননা দেওয়া হবে:

  • সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ব্যক্তি: ১৫ জন
  • সিনিয়র সিটিজেন (জ্যেষ্ঠ নাগরিক): ২ জন (১ জন পুরুষ ও ১ জন নারী)
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তি: ১ জন
  • নারী করদাতা: ৫ জন

২. পেশাজীবী শ্রেণি (৯ জন)

জাতীয় জীবনে বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেশাজীবী শ্রেণি থেকে মোট ৯ জন ব্যক্তি বেছে নেওয়া হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ১ জন করে এই সম্মাননা পাবেন:

  • বেতনভোগী
  • চিকিৎসক
  • সাংবাদিক
  • আইনজীবী
  • প্রকৌশলী
  • স্থপতি
  • চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CMA)
  • খেলোয়াড়
  • শিল্পী

৩. কোম্পানি ও শিল্প খাত (৩৯টি)

সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী হিসেবে সরাসরি ১৫টি কোম্পানিকে এবং দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন উদীয়মান ও মৌলিক ব্যবসায়িক খাত থেকে আরও ২৪টি কোম্পানিকে এই জাতীয় সম্মাননার জন্য চূড়ান্ত করা হবে। যেসব খাত থেকে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান
  • জীবনবিমা ও সাধারণ বিমা
  • চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ-রসায়ন
  • তৈরি পোশাক, স্পিনিং ও টেক্সটাইল
  • প্রকৌশল, ইস্পাত ও সিরামিক
  • কৃষি ও খাদ্য, পাট এবং চা শিল্প
  • জ্বালানি ও রিয়েল এস্টেট
  • প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া
  • চামড়া, শিক্ষা ও পর্যটন খাত

তিন ধাপের কঠোর নির্বাচন প্রক্রিয়া

সেরা করদাতা নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ এবং প্রভাবমুক্ত থাকে, সে জন্য তিন স্তরের সমন্বিত কমিটি গঠন ও যাচাই ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে:

[কর অঞ্চলসমূহ]
       │
       ▼ (প্রাথমিক তথ্য প্রেরণা)
[১. প্রাথমিক বাছাই কমিটি]
       │
       ▼ (খসড়া তালিকা)
[২. যাচাই কমিটি] ◄─── (দুদক, বিএফআইইউ, ব্যাংক ইত্যাদির তথ্য)
       │
       ▼ (অনুমোদন)
[৩. চূড়ান্ত নির্বাচন কমিটি] ──► (গেজেট প্রকাশ ও কার্ড প্রদান)
  1. প্রাথমিক বাছাই: আয়কর বিভাগের অধীনস্থ সকল কর অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক বাছাই কমিটি একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করবে।
  2. যাচাই-বাছাই: যাচাই কমিটি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে খসড়া তালিকার করদাতাদের ফৌজদারি, আর্থিক ও খেলাপি সংক্রান্ত যোগ্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে।
  3. চূড়ান্ত অনুমোদন: সব তথ্য পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত নির্বাচন কমিটি সেরা করদাতাদের তালিকা অনুমোদন করবে।

একই করদাতাকে কোনোভাবেই একাধিক ক্যাটাগরিতে সম্মাননার জন্য নির্বাচন করা যাবে না। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হবে। গেজেটে প্রকাশের পর তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে করদাতা সম্মাননা কার্ড ও বিশেষ স্মারক বা ক্রেস্ট দেওয়া হবে।

সুবিধা ও সম্মাননা প্রত্যাহারের সুযোগ

সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ গেজেট প্রকাশের তারিখ হতে পরবর্তী ২ (দুই) বছর পর্যন্ত সেরা করদাতা কার্ডের মেয়াদ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত জাতীয় সুবিধাদি ভোগ করতে পারবেন।

তবে সরকার নীতিমালায় স্পষ্ট করেছে যে, গেজেট প্রকাশের পরও যদি পরবর্তীতে কোনো করদাতার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, কর ফাঁকি বা আইন ভঙ্গের তথ্য প্রমাণিত হয়, তবে অনিবার্য কারণে সরকার যেকোনো সময় সংশ্লিষ্ট করদাতার সম্মাননা ও সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।

অতীত প্রেক্ষাপট

এর আগে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পূর্বে, ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিগত ২০২২-২৩ করবর্ষের আয়করের ভিত্তিতে মোট ১৪১টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স কার্ড বা কর কার্ড প্রদান করা হয়েছিল। সে সময় জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা হিসেবে ৭৬ জন ব্যক্তি, ৫৪টি প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ১১টি শ্রেণিতে সম্মাননা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ২০২২-২৩ অর্থবছরের সেরা করদাতা হিসেবে আরও ৫৪টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সম্মাননাপত্র প্রদান করে।

নতুন ২০২৬ সালের নীতিমালার মাধ্যমে সরকার সম্মাননা প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় সংখ্যা কমিয়ে এনে কেবল পরিচ্ছন্ন, দায়িত্বশীল ও সর্বোচ্চ অবদানকারী নাগরিকদের সম্মানিত করার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *