নতুন পে-স্কেল অনুমোদন, বাস্তবায়ন দুই অর্থবছরে

জাতীয় স্লাইড

সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। এই বৃদ্ধিতে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ২০ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এই তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়ে বলেন, আগামী দুই অর্থ বছরে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। তা কার্যকর করা হবে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে।

সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধান্তগুলো জানানো হয়। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০১৫ সালে। সেই অষ্টম পে স্কেল বাস্তবায়নের পর দীর্ঘদিন ধরে নবম পে স্কেল চাওয়া ছিল তাদের।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নতুন জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় বেতনস্কেল (পে স্কেল) ২০২৬’ অনুমোদন পেল। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা

নতুন বেতন কাঠামোতে আগে মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২০তম গ্রেডে আগে মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। আর প্রথম গ্রেডে ছিল ৭৮ হাজার টাকা।

নতুন কাঠামোয় প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিতীয় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ১ লাখ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৮৬ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ৫৮ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ৪৬ হাজার টাকা, নবম গ্রেডে ৪৪ হাজার টাকা, দশম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা, ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার টাকা, ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার টাকা, ১৯তম গ্রেডে ২০,৫০০ টাকা দাঁড়াচ্ছে।

ন্যায্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমানো হয়েছে। বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ অনুপাত কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে

নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা আগেই জানিয়েছিল সরকার। মন্ত্রিসভায় তেমন সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা জানিয়ে নাসিমুল গণি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এর কারণ হিসেবে বেতনস্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে ১ জুলাই, ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও একইভাবে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। সরকার মনে করছে, নতুন বেতন কাঠামো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভবপর হবে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অর্থ সংস্থান নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ‘মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, সরকার সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ (ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন) পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ পদ্ধতি একসঙ্গে বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় তা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

** মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ।

** ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ।

** ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ।

** ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬০ শতাংশ।

** ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৫৫ শতাংশ।

প্রথমবার প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা

নতুন বেতনস্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে। এছাড়া ডিজিটাল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন কেবল পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন বেতনস্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।

উপকারভোগী ৩৩ লাখ

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, সরকার মনে করছে, নতুন বেতনস্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এদিকে বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের জন্য (জুডিশিয়াল সার্ভিস) জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও জাতীয় বেতন কাঠামোর মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি

নতুন বেতন স্কেলে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ বিষয়ে এখনই তিনি কিছু বলতে পারছেন না। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও সরকারের আলোচনায় এসেছে বলে জানান তিনি। নাসিমুল গণি বলেন, ‘যারা বেতন স্কেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বেতন বৃদ্ধি জরুরি। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন পে স্কেল আসার পর এ বিষয়টির ‘গতিবেগ বাড়বে’। এটি আর আগের মতো পড়ে থাকতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *