পণ্য খালাসে কাস্টমসের বিলম্ব বন্ধে এনবিআরের কড়া নির্দেশ

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যকে আরো গতিশীল করতে এবং রাজস্ব প্রশাসনকে গ্রাহকবান্ধব রূপ দিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাণিজ্যিক পণ্যচালান পরীক্ষার নামে ব্যবসায়ীদের অযাচিত হয়রানি বন্ধ এবং দ্রুততম সময়ে কাস্টমস হাউস থেকে পণ্য খালাসের জন্য দেশের সব কাস্টমস হাউস ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে সংস্থাটি। এনবিআরের পাঠানো বিশেষ চিঠিতে মোট ১৩টি ধারায় কাস্টমস অ্যাসেসমেন্ট ও খালাস প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এনবিআরের জারিকৃত নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যমান কাস্টমস আইন বা বিধিমালায় উল্লিখিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া আমদানিকারক বা রপ্তানিকারকের কাছে কোনো অতিরিক্ত নথি দাবি করা যাবে না। প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে, যেসব নথি ইতোমধ্যে ডিজিটাল সিস্টেমে বা অনলাইনে দাখিল করা হয়েছে, কাস্টমস কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা তা পুনরায় ম্যানুয়ালি বা কাগজে দাখিল করার জন্য চাপ দিতে পারবেন না। এ ছাড়া, যেসব পণ্যচালান উচ্চ ঝুঁকিযুক্ত নয় এবং যেগুলোর ক্ষেত্রে এনবিআরের বিশেষ কোনো নিষেধাজ্ঞা বা পর্যবেক্ষণ নেই, সেগুলোর ফাইল অপ্রয়োজনে ফাইল আটকে রেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানোর প্রথা বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পণ্যচালান সরেজমিন পরীক্ষার (Physical Inspection) ক্ষেত্রেও কাস্টমসের যথেচ্ছ ক্ষমতায় লাগাম টানা হয়েছে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, যদি শুল্ক ফাঁকি বা কোনো ধরনের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকে, তবে একই পণ্যচালান একাধিকবার কাস্টমস বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনরায় পরীক্ষা করা যাবে না। রাজস্ব ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করে পণ্যচালান বাছাইয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কাস্টমসের মূল অ্যাসেসমেন্ট বা শুল্কায়নের সময় অপ্রয়োজনীয় বা দীর্ঘায়িত ধাপগুলো এড়িয়ে চলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কাস্টমস ও সরকারের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, এক সংস্থা পরীক্ষা করার পর অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা যেন সমন্বয়হীনভাবে আবার একই চালান আটকে রেখে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে। এছাড়া, বন্দরগুলোতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পণ্যজট কমাতে দ্রুততম সময়ে নিলাম কার্যক্রম সম্পাদন করা এবং সামগ্রিক রাজস্ব সুরক্ষায় তদারকি জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এই পদক্ষেপে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন দেশের তৈরি পোশাক ও রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এনবিআরের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবিরই একটি প্রতিফলন। মাঠপর্যায়ে যদি এই নির্দেশনার শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশে ব্যবসার খরচ (Cost of Doing Business) উল্লেখযোগ্য হারে কমবে এবং ব্যবসায়িক সহজীকরণ সূচকে দেশ এগিয়ে যাবে। এতে প্রকৃত এবং সৎ আমদানিকারক-রপ্তানিকারকরা কাস্টমসের হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন।

তবে পলিসি বা নীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই ব্যবসায়ী নেতা। মোহাম্মদ হাতেম মন্তব্য করেন, এনবিআরের শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের কাস্টমস কর্মকর্তাদের মানসিকতার ঘাটতির কারণে অতীতেও অনেক ভালো উদ্যোগ নস্যাৎ হয়েছে। বিশেষ করে নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের একটি অংশের অসদুপায় অবলম্বন ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতার কারণে সৎ ব্যবসায়ীরাই পদে পদে ভোগান্তির শিকার হন। সামান্য কোনো কেরানিগত বা নথিপত্রের ভুলের জন্য ভালো ব্যবসায়ীদের চালান আটকে রেখে অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা হয়, অন্যদিকে প্রকৃত শুল্ক ফাঁকি দেওয়া অসাধু ব্যবসায়ীরা ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যায়। তিনি অনিয়মকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার পরিবেশ পান।

অপরদিকে এনবিআরের শীর্ষ পর্যায়ের এমন নির্দেশনার বিপরীতে কাস্টমসের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাদের দাবি, বিদ্যমান প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সার্বিক অবকাঠামো তৈরি না করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া মূলত একটি ‘জনপ্রিয়তাবাদী’ (Populist) পদক্ষেপ। তিনি জানান, কাস্টমসে পণ্যের ঝুঁকি নির্ধারণ করার জন্য যে স্বয়ংক্রিয় ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ (ASYCUDA World) সিস্টেম বা সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, তা চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস ছাড়া দেশের অন্যান্য কাস্টমস হাউসগুলোতে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়। আগে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং সব হাউসের সক্ষমতা সমান পর্যায়ে উন্নীত করা না হলে এই ধরনের দ্রুত খালাস প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর অসাধু চক্র রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নিতে পারে।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এনবিআরের ১৩ দফার এই নির্দেশনাকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী সংস্কার হিসেবে ধরা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, এই নির্দেশনার সাফল্য নির্ভর করবে কাস্টমসের আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নীতিমালা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *