নারী বিশ্বকাপে ফিফার দ্বিগুণ বরাদ্দ রেকর্ড প্রাইজমানি

খেলা স্পেশাল

আগামী ২০২৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় নারী বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য প্রাইজমানির পরিমাণ একলাফে দ্বিগুণ করতে যাচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্ব ফুটবলে নারী ও পুরুষের বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। প্রাইজমানি দ্বিগুণ বাড়ানো সত্ত্বেও পুরুষদের বিশ্বকাপের আর্থিক অঙ্কের তুলনায় তা এখনো অনেক পেছনে। সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পূর্বঘোষিত ‘লিঙ্গ সমতা’ অর্জনের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ফিফা ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচনা করছেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ২০২৩ সালের নারী ফুটবল বিশ্বকাপে দলগুলোর জন্য সর্বমোট প্রাইজমানি রাখা হয়েছিল ১০ কোটি ডলারের সামান্য কিছু বেশি। পরবর্তী ২০২৭ ব্রাজিল আসরে এই বাজেট বাড়িয়ে মোট ২২ কোটি ডলারে উন্নীত করা হচ্ছে, যা নারী ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রাইজমানির রেকর্ড।

তবে বিশাল এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপের আর্থিক পার্থক্যের চিত্রটি অত্যন্ত প্রকট। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় আয়োজিত পুরুষদের সর্বাধুনিক ৪৮ দলের বিশ্বকাপের প্রাইজমানির তুলনায় নারী টুর্নামেন্টের এই বরাদ্দ সাকুল্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। উল্লেখ্য, ওই গ্রীষ্মকালীন টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া পুরুষ দলগুলোর জন্য ফিফার মোট প্রাইজমানি বাজেট ছিল ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। পরিসংখ্যানের এই বিশাল ব্যবধান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, মুখে সমতার কথা বলা হলেও বাস্তবে নারীদের ফুটবলে আর্থিক বৈষম্য রয়ে গেছে আগের মতোই।

‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ‘স্কাই স্পোর্টস’-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, ৪৮ দলের পুরুষ বিশ্বকাপ সম্পন্ন হওয়ার পর ফিফা প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের এক ঐতিহাসিক রেকর্ড আয়ের মুখ দেখেছে। সংস্থাটির আয়ের আর্থিক সক্ষমতা চূড়ায় পৌঁছালেও ২০২৭ সালের নারী বিশ্বকাপকে ঘিরে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দেওয়া ঐতিহাসিক অঙ্গীকারটি আলোর মুখ দেখেনি।

স্মর্তব্য যে, ২০২৩ সালের বিশ্বকাপের সময় সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রিতে এক নজিরবিহীন জটিলতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক অধিকাংশ সম্প্রচারকারী নেটওয়ার্ক ধরে নিয়েছিল যে, পুরুষদের টুর্নামেন্টের স্বত্ব কিনলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নারীদের টুর্নামেন্টের সম্প্রচারাধিকারও তারা পেয়ে যাবে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের এই মনোভাবের ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে তখন ইনফান্তিনো জোর গলায় ঘোষণা দিয়েছিলেন “আমাদের প্রধান লক্ষ্য ২০২৬ সালের পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ সালের নারী বিশ্বকাপে প্রাইজমানির ক্ষেত্রে শতভাগ সমতা নিশ্চিত করা। ফিফা কেবল ফাঁকা বুলি ছড়ায় না, কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করে।”

প্রাইজমানির এই বিশাল বৈষম্যের পেছনে বিশ্বমানের বাণিজ্যিক অংশীদার, মূলধারার স্পন্সর এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর বিনিয়োগে অনীহাকে দায়ী করেছেন ফিফা সভাপতি। ইনফান্তিনো তাঁর বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ফিফা নিজ থেকে পদক্ষেপ নিলেও ফুটবল ইন্ডাস্ট্রির বাকি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারেরা সেই পথে হাঁটছে না। তিনি সম্প্রচার মাধ্যম ও স্পন্সরদের নারী ফুটবলে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগের কঠোর আহ্বান জানান।

তবে বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে করা ইনফান্তিনোর এই অভিযোগ বাণিজ্যিক বাজারে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। উল্টো অনেক বড় বড় স্পন্সর ও মিডিয়া হাউস ফিফার ওপর চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সমালোচকরাও ফিফার এই দ্বিমুখী নীতির কড়া সমালোচনা করে বলেন, ফিফা বৈশ্বিক নারী ফুটবলে মোট আয়ের যে সামান্য অংশ বিনিয়োগ করে, তার তুলনায় বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ফুটবলে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ক্লাব ও স্পন্সররা অনেক বেশি অর্থ ঢালছে। তাই নিজেদের ব্যর্থতার দায় চাপানোর সুযোগ ফিফার নেই।

প্রাইজমানির মূল অঙ্কে বিশাল ব্যবধান থেকে গেলেও একটি জায়গায় অন্তত পুরুষ দলগুলোর সমকক্ষ হতে পেরেছে নারী দলগুলো। ফিফার আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ২০২৭ ব্রাজিল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি নারী ফুটবল দল পুরুষ দলের সমান সমান প্রস্তুতিমূলক অর্থ (Preparation Funds) পাবে।

পূর্বে এই খাতের পরিমাণ কম থাকলেও পরবর্তী আসরের জন্য প্রতিটি জাতীয় দলের বাজেট দ্বিগুণ করে ২৫ লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া দেশগুলো টুর্নামেন্টের আগে উন্নতমানের অনুশীলন ক্যাম্প, আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ এবং টেকনিক্যাল সুবিধা সুনিশ্চিত করতে পারবে।

সব মিলিয়ে, প্রাইজমানি ২২ কোটি ডলারে উন্নীত করা নিশ্চিতভাবেই নারী ফুটবলের বাণিজ্যিক প্রসারে একটি বড় ইতিবাচক ধাপ। তবে পুরুষ ও নারী ফুটবলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈষম্যের প্রাচীর ভাঙতে ফিফা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সত্তাগুলোকে যে আরও দীর্ঘ পথ হাঁটতে হবে, তা আবারও পরিষ্কার হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *