প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে যা বললেন হাসনাত আব্দুল্লাহ

রাজনীতি স্লাইড

 

জ্বালানি সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী যে ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, তা গ্রহণ করে নিজেদের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, জ্বালানি সংকট সমাধানের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই বিরোধী দলের কাছে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে সেই পরিকল্পনা পড়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব কথা বলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

এনসিপি দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা প্রদানের জন্য ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম এবং সমাধান পরিকল্পনা প্রস্তাব করছি।’

তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ দেয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর জানা দরকার ছিল যে সমাধান ইতিমধ্যেই টেবিলে আছে। এনসিপির আহ্বায়ক, সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জনাব নাহিদ ইসলাম স্বল্প (৩০ দিন), মধ্য (৬ থেকে ১৮ মাস) ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ে মোট ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব দিয়েছেন।’

হাসনাতের দাবি, তিনি ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন কোন সিদ্ধান্তটি কোথায় ভুল হয়েছে। ভর্তুকি নীতি, ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সুস্পষ্ট সমাধানধর্মী বক্তব্য দিয়েছেন। নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও মতামত এসেছে। এসব জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেমিনারে আলোচিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঢাউস সাইজের মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ থাকা সত্ত্বেও এই তথ্য তার কাছে পৌঁছায়নি, এটি লজ্জার কথা।’

হাসনাত বলেন, ‘মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে ৬২ জনের সভাসদ। এর একজনও নাগরিক মতামত বা বিরোধী দলের প্রস্তাবনা পড়ে দেখেননি, গণতান্ত্রিক চর্চায় এর চেয়ে খারাপ উদাহরণ কম আছে। প্রশ্নটা আর নীতির নয়, প্রশ্নটা এখন এই টিমের কার্যকারিতা ও যোগ্যতার।’

এনসিপির দেয়া ৩০ দিনের জন্য পাঁচটি, মধ্যমেয়াদি (৬ থেকে ১৮ মাস) ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদে চারটি সুস্পষ্ট সমাধান প্রস্তাব পড়ে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে বিরোধী দল থেকে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকার অনুরোধেও সাড়া দেয়ার আহ্বান জানান হাসনাত।

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের এমন ইগ্নোরেন্সকে খুবই হতাশার চোখে দেখি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশালাকার টিমের সক্ষমতা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি।’

হাসনাতের অভিযোগ, ছয় মাসে প্রশাসনে যে হারে দলীয় পদায়ন হয়েছে, তাতে ইনস্টিটিউশনাল মেমরি বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। ফলে ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নেই।

তিনি বলেন, ‘ভর্তুকি কাটা হয়েছে ঠিক সেখান থেকে যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসে, আর ক্যাপাসিটি চার্জ অক্ষত। সচিবালয়ে যারা এসেছেন তারা নতুন, অনভিজ্ঞ এবং লবি গ্রুপের পরামর্শে চলছেন।’

মহেশখালী এফএসআরইউ-তে আগুন লাগার পর রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটি ছিল কি না, সেই স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। ‘নাশকতা নাকি অবহেলা, সরকার নিজেই জানে না’—বলেন হাসনাত।

হাসনাত বলেন, সরকার বলছে ডলার ও বকেয়ার কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি কেনা যাচ্ছে না। দেশের অধিকাংশ ভারী শিল্প বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদিত মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫ এখনো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কেন।

তার দাবি, এই কাঠামোয় বেসরকারি উৎপাদক সরাসরি বড় শিল্প ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে। দর দুই পক্ষ ঠিক করবে, বিইআরসি কেবল অবহিত থাকবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যাবে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক টাকাও লাগবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, ‘বাকি কাজ কেবল এসএলএ ফরম্যাট ও হুইলিং চার্জ চূড়ান্ত করা, যা কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক কাজ, রকেট সায়েন্স নয়।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলার আগেই আমরা সমাধান দিয়েছি। আপনারা সেটা পড়ার দরকার মনে করেননি কিংবা আপনার কাছে পৌঁছানো হয়নি। তথাপি, ছয় মাসের হিসাবটা আমরা মেনে নিলাম। কিন্তু ঘড়িটা বিরোধী দলের নয়, আপনার সরকারের।’

মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নে ছয় মাসের বেশি সময় লাগলে সেটি নীতির প্রশ্ন থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত। তার ভাষায়, ‘সেটি হবে সক্ষমতার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।’

হাসনাত বলেন, ‘প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ মন্ত্রী ও অযোগ্য লোক দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” বলে না। এটা হচ্ছে “আই হ্যাভ নো প্ল্যান”-এর টেস্টিং।’

তিনি বলেন, ‘একটি প্র্যাক্টিসিং ডেমোক্রেসিতে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলকে আল্টিমেটাম কিংবা চ্যালেঞ্জ দেন না, বরং সরকারই তার কাজের জবাবদিহি করে।’

এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহি করা উচিত ছিল উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, ‘সরকার ছয় মাস ক্ষমতায়, আর দেশ এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ে কেন পড়লো! এই রাষ্ট্র কেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো?’

সবশেষে হাসনাত বলেন, ‘সমাধান আমাদের হাতে আছে। কিন্তু ক্ষমতা আপনার হাতে। ছয় মাস পর জনগণ জানতে চাইবে, দুটির মধ্যে কোনটির অভাবে দেশ অন্ধকারে ছিল।’

উল্লেখ্য, শনিবার রাজধানীর মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলকে ‘বিভ্রান্তির রাজনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সত্যিকার জনগণের কাজ হতে পারে, দেশ এগিয়ে যেতে পারে—এরকম যদি কোনো পরিকল্পনা আপনাদের কাছে থাকে, তাহলে উপস্থাপন করুন, সংসদে আনুন। সেই পরিকল্পনা যদি ভালো হয়, বাস্তবসম্মত হয়, দেশ ও মানুষের উপকারে আসে অবশ্যই আমরা সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই রাজনৈতিক দলকে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই আপনারা যদি মনে করেন জনগণের প্রতি আপনাদের দায়িত্ব আছে, তাহলে পরিকল্পনা নিয়ে আসুন জনগণের সামনে। বিদ্যুতের সমস্যা, গ্যাসের সমস্যা সমাধানে সরকারের থেকে ভালো কোনো পরিকল্পনা তারা যদি নিয়ে আসতে পারেন…যে পরিকল্পনায় আগামী তিন মাস না হোক ছয় মাসের মধ্যে সমাধান হতে পারে, তাহলে তাদের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *