দেশের সেবা খাতের আকার বেড়েছে প্রায় ১১.৫ শতাংশ: বাংলাদেশ ব্যাংক

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে শিল্প ও কৃষির পাশাপাশি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে সেবা খাত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে মন্দাভাবের মধ্যেও বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে লক্ষ্যণীয় বিস্তার দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশের সেবা খাতের আকার বেড়েছে প্রায় ১১.৫ শতাংশ।

আকারের বিস্তার ও পাঁচ বছরের ধারাবাহিক হিসাব

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সেবা খাতের মোট বাজার বা আর্থিক আকার দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকায়। এর ঠিক আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এর আকার ছিল ২৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে নতুন করে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি হয়েছে।

বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেবা খাত প্রতি বছরই নতুন মাইলফলক স্পর্শ করছে:

  • ২০২০-২১ অর্থবছর: ১৮ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২১-২২ অর্থবছর: ২০ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২২-২৩ অর্থবছর: ২২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ২৫ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ২৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৫-২৬ অর্থবছর: ৩২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা

অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সেবা খাতের আকার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, যা দেশের সার্বিক অভ্যন্তরীণ চাহিদার দ্রুত প্রসারের ইঙ্গিত দেয়।

যেসব খাতের ওপর ভিত্তি করে প্রবৃদ্ধি

বর্তমানে সেবা খাতের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বহুমুখী। এই খাতের প্রসারে যেসব অনুসঙ্গ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে তার মধ্যে অন্যতম হলো:

  • পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা-বাণিজ্য
  • পরিবহন, যোগাযোগ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা
  • আর্থিক সেবা খাত (ব্যাংক, বীমা ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস)
  • আবাসন ও রিয়েল এস্টেট খাত
  • তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) ও ডিজিটাল রূপান্তর
  • হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিনোদন খাত
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য পেশাগত সেবা

প্রবৃদ্ধির নেপথ্য কারণ ও অর্থনীতিবিদদের মতামত

অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের বার্ষিক আয় বৃদ্ধি, নগরায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় সেবা খাতের সম্প্রসারণ ঘটছে। পণ্য উৎপাদন বা কৃষিকাজের পাশাপাশি বাণিজ্য সঞ্চালন, মূলধন সরবরাহ, দ্রুত যোগাযোগ এবং আধুনিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার প্রতি জনগণের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ।

তবে খাতটির কেবল সংখ্যাগত বা আর্থিক আকার বৃদ্ধিই অর্থনীতির চূড়ান্ত সক্ষমতার পরিচয় দেয় না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সেবা খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনই জোর দেওয়া প্রয়োজন:

  • উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি: প্রথাগত সেবার বদলে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদান এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।
  • সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে নীতিগত সহায়তা: বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং), ফিনটেক, লজিস্টিকস, পর্যটন ও পেশাদার সেবায় বিশেষ সরকারি ছাড় ও প্রণোদনা প্রদান।
  • উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান: সেবা খাতে বৈচিত্র্য এনে মানসম্মত ও বেশি বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

পোশাক রপ্তানিতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও প্রযুক্তিভিত্তিক ও উৎপাদনশীল সেবা খাতকে শক্তিশালী করা গেলে তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় সুরক্ষা বর্ম হিসেবে কাজ করবে।

জিডিপিতে নতুন রেকর্ড

সেবা খাতের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঢেউ পড়েছে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনেও (জিডিপি)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করতে যাচ্ছে, যার সিংহভাগ অবদান এসেছে এই সেবা খাত থেকেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *