কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এআই কোম্পানি অ্যান্থ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেই চীনে উন্নত এআই চিপ বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপের আহ্বান জানানোর পর চীন এই পদক্ষেপকে ‘ভয় ছড়ানো’ বলে সমালোচনা করেছে।
গত শনিবার আমোদেই সতর্ক করেন, সবচেয়ে শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাগুলোর উন্নয়নের গতি কমানো দরকার। তিনি বলেন, এগুলো শিগগির মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। এক রচনায় তিনি লেখেন, ‘এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। আমার আশঙ্কা, ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই ধরনের একটি দল পুরো ইন্টারনেট দখল করে নিতে পারবে। এর ফলে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়া এআই আরও শক্তিশালী হলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে।’
আমোদেইয়ের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অলটম্যান এবং স্পেসএক্স ও টেসলার প্রধান এলন মাস্ক।
তবে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতি কমানোর এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এআইতে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছি। যে এআইতে জেতে, সে-ই সবকিছুতে জেতে।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সোমবার বলেন, ‘বিভিন্ন হুমকি তৈরি করা, সংঘাত ও বিদ্বেষমূলক প্রতিযোগিতায় নামা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে বাধা দেবে এবং এটা কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়।’
রাষ্ট্র সমর্থিত গ্লোবাল টাইমস আমোদেইয়ের প্রস্তাবকে ‘শীতল যুদ্ধের কৌশল’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, এর আসল উদ্দেশ্য চীনের এআই উন্নয়ন ঠেকানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখা। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ‘এই নীরব এআই শীতল যুদ্ধ কপটতাপূর্ণ ও দূরদর্শিতাহীন।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই রেসে যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে আছে, তবে চীন ব্যবধান কমিয়ে আনছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এআই সূচক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মার্কিন কোম্পানিগুলো এআইতে ২৮ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীন করেছে ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপেও যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা আছে।
তবে চীনা কোম্পানিগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, উন্নত চিপে প্রবেশাধিকার ছাড়াও তারা কার্যকর এআই মডেল তৈরি করতে পারে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনা স্টার্টআপ ডিপসিকের প্রকাশ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম পড়িয়ে দিয়েছিল। কোম্পানিটি দাবি করেছিল, তাদের মডেল তৈরিতে প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক কম খরচ হয়েছে। ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ডিপসিক জানিয়েছিল, তাদের সর্বশেষ মডেল প্রশিক্ষণে মাত্র ৬০ লাখ ডলারের কম্পিউটিং শক্তি লেগেছে। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৪ প্রশিক্ষণে খরচ হয়েছিল ১০ কোটি ডলারেরও বেশি।
এআই নিয়ে উভয় দেশ নিজেদের দায়িত্বশীল বলে দাবি করলেও দুই দেশই এই প্রযুক্তিকে সামরিক ও নিরাপত্তা কাজে ব্যবহার করছে। জুনে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেয়। মার্চে মার্কিন সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা এআই ব্যবহার করেছে।
এআই নাও ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ভিজিটিং ফেলো আয়া ইব্রাহিম আল জাজিরাকে বলেন, এআই উন্নয়নকে একটি রেস হিসেবে দেখানোটাই সমস্যার। তিনি বলেন, ‘রেসের এই ধারণাটাই মূলত সমস্যাজনক। কারণ এতে আমরা তলানিতে পৌঁছানোর দৌড়ে নেমে যাচ্ছি। তাহলে তুমি জিতলে, তবে তার জন্য কী মূল্য দিতে হলো তোমাকে?’
