ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী

স্বাস্থ্য স্লাইড

 

দেশে দেড় মাস ধরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে দেশের সব জেলায় রোগটির বিস্তার ঘটেছে।

আক্রান্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুও। তাদের সংখ্যা ৫৮৪, যা মোট রোগীর ৬ শতাংশ। দেখা গেছে, ১৫ বছরের কম বয়সী আক্রান্তদের মধ্যে শিশু রয়েছে প্রতি পাঁচজনে একজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা গেছে।

গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টার ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দিনে নতুন করে আরো ৯৪ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সময়ে কারো মৃত্যু হয়নি। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ৭৭০ এবং   মৃত্যু ৩২।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তের ৬১ শতাংশ পুরুষ ও ৩৯ শতাংশ নারী।

১৫ বছর বা তার কম বয়সী ডেঙ্গু রোগী এক হাজার ৮১৮ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় ১৯ শতাংশ শিশু। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী আক্রান্ত ৫৮৪ জন, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী ৫৭১ জন এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৬৬৩ জন।

কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী আক্রান্ত ছয় হাজার ৭৯৯ জন, যা মোট আক্রান্তের ৭০ শতাংশ। ৫০ বছরের বেশি বয়সী আক্রান্ত এক হাজার ১৫২ জন বা ১১.৭৯ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষম তরুণদের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কর্মক্ষম ব্যক্তিরা

কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত এবং অপরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। শিশুরা মূলত ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাসের কারণে ঝুঁকির মুখে।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। এক. সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা। শুধু পানি পরিষ্কার রাখলেই হবে না, বরং বর্জ্য নিষ্কাশনসহ নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দুই. দ্রুত শনাক্তকরণ। জ্বর হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়েই যেন বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সঠিক চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা যায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ হতে পারে। এখনই কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কবিরুল বাশার বলেন, এ বছর বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

কয়েক বছরে বদলে গেছে চিত্র : তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত আক্রান্তদের ৭৬ শতাংশ ঢাকার বাইরের। এ ধারা চার বছর ধরে চলছে। এর আগে ২০২১ সালে মোট ডেঙ্গু রোগীর মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়।

সর্বশেষ তথ্য মতে, ঢাকা মহানগরে আক্রান্ত দুই হাজার ৩৪১ জন। ঢাকা বিভাগে (মহানগরের বাইরে) আক্রান্ত এক হাজার ১৭২ জন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে দুই হাজার ৪৪৩ জন, যা মোট রোগীর ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারজন রোগীর একজন বরিশাল বিভাগের।

শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জানান, ২০১৫ সালের আগে ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। এর পর থেকে ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরে রোগী বাড়তে থাকে। বর্তমানে মোট আক্রান্ত রোগীর ৬০ শতাংশের বেশি ঢাকার বাইরের।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, গত ২৫ বছরেও ঢাকায় কার্যকরভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরো সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুবই কঠিন হবে।

সরকার যা করছে : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুই মাস ধরে সরকার সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে একটি ডেইলি ট্রিটমেন্ট প্রটোকল তৈরি করে তা সব চিকিৎসকের মোবাইলে ও ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মেডিক্যালের কারিকুলাম আরো আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে করা হবে। এরই মধ্যে  কাজ শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম বলেন, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের জন্যও পরীক্ষার সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে না হয়। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *