তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে ২.২২ শতাংশ

অর্থনীতি স্লাইড

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান মন্থরতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির সর্বশেষ প্রান্তিক হিসাবেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ২২ শতাংশে। এর মাধ্যমে টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকেই প্রবৃদ্ধি কমার ধারাবাহিকতা বজায় থাকল। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন, পরিবহন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে ধীরগতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে এই প্রবৃদ্ধির হিসাবে।

সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর–ডিসেম্বর) তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে। আর তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরু থেকে প্রতিটি পরবর্তী প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

বিবিএসের প্রকাশিত তথ্য বলছে, অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাত—কৃষি, শিল্প ও সেবা—সব ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত শিল্প খাত এবার ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে।

একই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ২৭ শতাংশে। আর তৃতীয় প্রান্তিকে তা আরও কমে ঋণাত্মক হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি, রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং নির্বাচনী সময়ের অনিশ্চয়তার কারণে শিল্প খাতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষি খাতেও প্রবৃদ্ধি আগের দুই প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অথচ প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ১১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে হয়েছিল ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

সেবা খাতেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা এ খাতের প্রবৃদ্ধি তৃতীয় প্রান্তিকে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে। প্রথম প্রান্তিকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ছিল ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ সেবা খাতেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রবৃদ্ধি কমেছে।

অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাতেই একযোগে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিও নিম্নমুখী হয়েছে। বিশেষ করে শিল্প খাতের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে গত জুন মাসে বিবিএস ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, পুরো অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে চারটি প্রান্তিকের সাময়িক হিসাব প্রকাশের পর বিবিএস পরবর্তীতে চূড়ান্ত জিডিপি হিসাব প্রকাশ করবে। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সাময়িক ও চূড়ান্ত হিসাবের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।

বিবিএস জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে তারা নিয়মিতভাবে প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপির প্রাক্কলন প্রকাশ করে আসছে। এর ফলে বছরের মধ্যেই অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আগে কেবল পুরো অর্থবছরের হিসাব প্রকাশ করা হলেও এখন প্রতি তিন মাস অন্তর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে স্থির মূল্যে দেশের জিডিপির পরিমাণ হয়েছে ৯ লাখ ৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। এর আগের দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্থির মূল্যে জিডিপির পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪০৩ কোটি টাকা। আর প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১০ কোটি টাকা। উৎপাদনের পরিমাণে পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের প্রবৃদ্ধির হারও অর্থনীতির সামগ্রিক গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার আর্থিক মূল্যের সমষ্টি। কোনো অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় জিডিপি যত শতাংশ বাড়ে বা কমে, সেটিই বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে, একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিকে আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় উৎপাদন কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তা দিয়ে নির্ধারণ করা হয় প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি। আর কোনো প্রান্তিকে উৎপাদন আগের তুলনায় কমে গেলে সেই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়।

সর্বশেষ প্রকাশিত প্রান্তিক হিসাব থেকে স্পষ্ট যে, চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিল্প, কৃষি ও সেবা—তিনটি প্রধান খাতেই প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এখন চতুর্থ প্রান্তিকের হিসাব এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত চূড়ান্ত জিডিপি প্রতিবেদনের দিকে নজর থাকবে, যাতে পুরো অর্থবছরের অর্থনৈতিক চিত্র আরও পরিষ্কারভাবে উঠে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *