নতুন অর্থবছরে রপ্তানি প্রণোদনা বহাল

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

বাংলাদেশের নতুন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের নগদ সহায়তা বা রপ্তানি প্রণোদনা কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সরকার আগের অর্থবছরের নীতিই বহাল রেখে ৪৩টি রপ্তানি খাতের জন্য বিদ্যমান নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে রপ্তানিকারকরা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে যে হারে প্রণোদনা পেয়েছেন, নতুন অর্থবছরেও একই হারে সুবিধা পাবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে রপ্তানি খাতে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে রোববার একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। পরে সেই সার্কুলার বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়। সার্কুলারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্ধারিত ৪৩টি রপ্তানি পণ্যের বিপরীতে আগের মতোই দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা দেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনো খাতেই প্রণোদনার হার কমানো বা বাড়ানো হয়নি। ফলে রপ্তানিকারকদের জন্য বিদ্যমান সুবিধা অপরিবর্তিত থাকছে এবং তারা আগের নীতিমালা অনুযায়ীই প্রণোদনা গ্রহণ করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই সরকার এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। রপ্তানি খাতে স্থিতিশীল নীতিমালা থাকলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণে উৎসাহিত হন এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা সহজ হয়। বিশেষ করে বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে একই ধরনের প্রণোদনা অব্যাহত থাকায় রপ্তানিকারকদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে নগদ সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে আগের মতোই কয়েকটি শর্ত পালন বাধ্যতামূলক থাকবে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনতে হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় দলিল, কাগজপত্র ও ব্যাংকিং নথি নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী জমা দেওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকরা নগদ সহায়তার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। এসব শর্ত পূরণ না হলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রণোদনার সুবিধা পাবেন না।

তৈরি পোশাক খাতের জন্য আগের মতোই বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। দেশীয় বস্ত্র ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বিকল্প নগদ সহায়তা হিসেবে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে। এছাড়া ইউরো অঞ্চলে পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত বিশেষ সহায়তা হিসেবে আরও ০ দশমিক ৫০ শতাংশ সুবিধা অব্যাহত থাকবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অতিরিক্ত ৩ শতাংশ নগদ সহায়তা বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে নতুন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে বিশেষ নগদ সহায়তা হিসেবে ০ দশমিক ৩০ শতাংশ সুবিধাও বহাল রাখা হয়েছে।

দেশের ঐতিহ্যবাহী পাট ও পাটজাত শিল্পেও আগের মতোই উচ্চ হারে প্রণোদনা দেওয়া হবে। বৈচিত্র্যপূর্ণ পাটপণ্য রপ্তানিতে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া পাটজাত চূড়ান্ত পণ্যে ৫ শতাংশ এবং পাট সুতা বা ইয়ার্ন ও টোয়াইন রপ্তানিতে ৩ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাটপণ্যের রপ্তানি আরও উৎসাহিত করতেই এ সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পও নতুন অর্থবছরে আগের মতো সরকারি সহায়তা পাবে। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের হস্তশিল্প খাতের জন্য ৬ শতাংশ নগদ সহায়তা অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের হস্তশিল্প ও চামড়াজাত পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়াতে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক রপ্তানি পণ্যেও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা বহাল রয়েছে। কৃষিপণ্য, আলু, হাড়া, কাঁকড়া এবং বিভিন্ন ধরনের কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানিতে এই সুবিধা দেওয়া হবে। সরকারের আশা, এ খাতে প্রণোদনা অব্যাহত থাকায় কৃষিপণ্য ও মৎস্যজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

শিল্প খাতের বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যেও আগের মতো প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে। জাহাজ রপ্তানিতে ৬ শতাংশ এবং পার্টিকেল বোর্ড রপ্তানিতে ৮ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া আসবাবপত্র, প্লাস্টিক, কাগজ, সিরামিক, রেজর, মোটরসাইকেল, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আইটি ও আইটিইএস সেবা, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, সোলার ফটোভোল্টাইক মডিউল, কেবল, গ্যালভানাইজড স্টিল শিটসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে বহুমুখী রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও আগের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। সফটওয়্যার, আইটিইএস এবং হার্ডওয়্যার রপ্তানিতে ৬ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সারদের বৈধ রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ সহায়তা বহাল থাকবে। ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেবা রপ্তানি সম্প্রসারণে এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সার্বিকভাবে নতুন ২০২৬–২৭ অর্থবছরে রপ্তানি প্রণোদনার হার অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বিদ্যমান নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে রপ্তানিকারকরা আগের মতোই সরকারি নগদ সহায়তার সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *