১৮ বাজারে বাণিজ্য কৌশল

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি আয়ের মন্দা কাটিয়ে উঠতে এক নতুন কৌশলগত পদক্ষেপে নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে বহুমুখী করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বিশ্বের সম্ভাবনাময় ১৮টি দেশকে ঘিরে আলাদা দেশভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে এশীয় ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার (Supply Chain) সঙ্গে বাংলাদেশকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হলো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো চিহ্নিত ১৮টি দেশের বাজার বিশ্লেষণ করে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক রোডম্যাপ তৈরি করছে। এই দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে—

  • এশীয় অঞ্চল: চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া
  • পশ্চিমা ও অন্যান্য অঞ্চল: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদাররা।

এই দেশভিত্তিক কৌশলের আওতায় প্রধানত ৪টি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে: ১. চাহিদা বিশ্লেষণ: প্রতিটি দেশের স্থানীয় বাজারে ঠিক কী ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে তা শনাক্ত করা। ২. বাণিজ্য বাধা দূরীকরণ: শুল্ক ও অ-শুল্ক (Tariff & Non-tariff) বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। ৩. প্রতিযোগী মোকাবিলা: ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল পর্যালোচনা করা। ৪. নতুন পণ্য নির্বাচন: পোশাকের বাইরে বাংলাদেশ থেকে নতুন কোন কোন পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব, তার তালিকা প্রণয়ন।

বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত একটি গভীর কাঠামোগত ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে এই কৌশলগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  • একক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০.৬২ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক (RMG) খাত থেকে। পোশাক খাতের সামান্য ওঠানামাও পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
  • ইউরোপীয় ইউনিয়নে ধস: ইউরোপের বাজারে গত আট মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১১.৬৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
  • যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মন্দা: প্রধান রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই সময়ে পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ৬.৫ শতাংশ।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক খাত ও পশ্চিমা বাজারের এই সংকুচিত অবস্থা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে—শুধুমাত্র ইউরোপ-আমেরিকার ওপর ভরসা করে বসে থাকার দিন শেষ। বিকল্প বাজার অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি।

বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ার দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এশিয়ার বড় বড় অর্থনীতিগুলোতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হলেও সেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনও বেশ সীমিত। তবে সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে:

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের হিসাব (EPB অনুযায়ী):

  • চীন: রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৩৩%
  • ভারত: রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫.৪৪%
  • দক্ষিণ কোরিয়া: রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৭.২৯%

যদিও এই প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক, তবুও এই বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখনও বিশাল। অর্থাৎ, আমরা এসব দেশ থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করি, সে তুলনায় রপ্তানি খুবই নগণ্য। এই ব্যবধান কমাতেই ১৮ দেশের বিশেষ উদ্যোগ সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই দেশভিত্তিক কৌশলকে সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।

  • সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, “বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্র এখন এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আঞ্চলিক বাজারগুলোর সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক উৎপাদন সরবরাহ ব্যবস্থার (Regional Value Chain) অংশ হতে হবে।”
  • সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান পরামর্শ দিয়ে বলেন, “আমাদের কেবল ঐতিহ্যবাহী পণ্য রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পণ্যের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি (IT), দক্ষতাভিত্তিক সেবা এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে রপ্তানি সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।”

রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে কৌশল বাস্তবায়নে কিছু মূল চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছেন:

  • আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চলে বাধা: মালয়েশিয়াসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্কহার এবং কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
  • মানোন্নয়ন ও গতি: প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে টিকতে হলে পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা, দ্রুত পণ্য সরবরাহ (Lead Time কমানো) এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
  • বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ: স্থানীয় ও বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে অবকাঠামোগত সুবিধা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বিশ্ববাজারের বর্তমান অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখতে বহুমুখী কৌশল বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। ১৮টি দেশের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাণিজ্য বাধা দূর করা, সেবা খাতের বিস্তার এবং বিনিয়োগের ভালো পরিবেশ তৈরি করা গেলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ তার রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *