আমদানি নীতি আদেশের সুনির্দিষ্ট নিয়ম লঙ্ঘন করে কাঁচামাল বা বর্জ্য ‘স্ক্র্যাপ’ (Scrap) ঘোষণার আড়ালে অন্য যেকোনো এইচএস কোডের পুনর্ব্যবহারযোগ্য (Reusable) বা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির স্পষ্ট বার্তা—অনুমোদিত তালিকার বাইরে স্ক্র্যাপের নামে অন্য কোনো পণ্য বাংলাদেশে আনা সম্পূর্ণ বেআইনি। এরপরও যদি কোনো আমদানিকারক শুল্ক ফাঁকি দিতে কিংবা আইন ফাঁকি দিয়ে অন্য পণ্যের চালান স্ক্র্যাপ হিসেবে খালাসের চেষ্টা করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও ফৌজদারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্প্রতি জারি করা এক বিশেষ পরিপত্রে এই কঠোর নির্দেশনার কথা জানানো হয়েছে। পরিপত্রটি ইতোমধ্যে দেশের সকল কাস্টমস হাউস, সরকারি সংশ্লিষ্ট দফতর, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী স্ক্র্যাপ হিসেবে কেবল যা আনা যাবে
এনবিআরের পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, দেশের রাজস্ব বিভাগ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯’ (এবং পূর্ববর্তী আমদানি নীতিসমূহ) অনুযায়ী কেবল প্রকৃত ব্যবহারকারী হিসেবে নিবন্ধিত ইস্পাত প্রস্তুতকারী বা রি-রোলিং মিলগুলো শিল্প কাঁচামাল হিসেবে স্ক্র্যাপ আমদানির সুযোগ পায়। এই আমদানির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নির্ধারিত এবং এর আওতায় আমদানিকারকরা তাদের নির্দিষ্ট অনুমোদন বা উৎপাদন ক্ষমতার উপর ভিত্তি করেই পণ্য আনতে পারেন।
আন্তর্জাতিক শুল্ক ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক পরিভাষা অনুসারে, নির্দিষ্ট এইচএস হেডিং ৭২.০৪ (HS Heading 72.04) এবং এর আওতাভুক্ত নির্ধারিত এইচএস কোডসমূহের বিপরীতে যেসব পণ্য তালিকাভুক্ত রয়েছে, কেবল সেগুলোকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্ক্র্যাপ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। ৭২.০৪ হেডিংয়ের অধীন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই স্ক্র্যাপের তালিকায় রয়েছে:
- ঢালাই লোহার ভাঙা অংশ বা বর্জ্য (Cast iron scrap/waste)
- স্টেইনলেস স্টিলের স্ক্র্যাপ (Stainless steel scrap)
- অন্যান্য সংকর ধাতু বা অ্যালয় স্টিলের স্ক্র্যাপ (Other alloy steel scrap)
- টিনযুক্ত লৌহ বা ইস্পাত বর্জ্য (Tinned iron or steel scrap)
- শিল্প প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে সৃষ্ট ধাতব কাটিং ও বর্জ্য (Processing waste and cuttings)
- অন্যান্য অনুমোদিত বর্জ্য ধাতু এবং পুনরায় গলানোর যোগ্য স্ক্র্যাপ ইনগট (Re-melting scrap ingots)।
পরিপত্রে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, এই তালিকায় উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট পণ্যের বাইরে আর কোনো শ্রেণিবিন্যাসযোগ্য পণ্যকে স্ক্র্যাপ ঘোষণা দিয়ে খালাস করা যাবে না।
অসাধু আমদানিকারকদের জালিয়াতি ও কাস্টমসের চ্যালেঞ্জ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পর্যবেক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ তদারকিতে দেখা গেছে, একশ্রেণীর অসাধু আমদানিকারক রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এবং উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে পার করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়মিত জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন। তারা স্ক্র্যাপের মিথ্যা ঘোষণা (False Declaration) দিয়ে অন্য এইচএস কোডের পুনর্ব্যবহারযোগ্য ভালো মানের পণ্য বা তৈরি ধাতব পণ্য আমদানি করে কাস্টমস চত্বরে নিয়ে আসেন।
কাস্টমস কর্মকর্তারা যখন নিয়মিত কায়িক পরীক্ষা ও চালানের নমুনা যাচাইকালে এসব অসঙ্গতি ধরে ফেলেন এবং অনিয়মের কারণে চালান আটকে দেন, তখন সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকরা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পণ্য খালাসে মরিয়া হয়ে ওঠেন। আটককৃত আইনি অযোগ্য চালানগুলো ছাড়িয়ে নিতে আমদানিকারকরা বারবার উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী আইনি জটিলতা তৈরি হয়, কাস্টমসের স্বাভাবিক শুল্কায়ন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয় এবং বন্দরে কন্টেইনার জট সৃষ্টি হয়।
উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ ও মৌখিক নির্দেশনা
আমদানি নীতি বহির্ভূত এই ধরণের অপতৎপরতা বন্ধে বিগত বছরে একটি রিট মামলার শুনানিকালে উচ্চ আদালত অত্যন্ত কঠোর পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। মাননীয় হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেন, জাতীয় আমদানি নীতি আদেশের মূল নির্দেশনার বাইরে গিয়ে স্ক্র্যাপের নামে অন্য কোনো পণ্য আমদানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা অনুমোদনযোগ্য নয়। আদালত কাস্টমস ও এনবিআরকে নির্দেশ দেন যেন বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে অবিলম্বে দেশের সর্বসাধারণ ও সর্বস্তরের আমদানিকারকদের এই আইনি নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত উক্ত বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে এনবিআরকে অনতিবিলম্বে পুনরায় একটি স্পষ্ট ও সর্বজনীন পরিপত্র জারির জন্য মৌখিক নির্দেশনা প্রদান করেন। আদালতের নির্দেশনার আলোকেই এনবিআর তড়িঘড়ি করে এই নতুন পরিপত্রটি জারি করে যা পুরো বাণিজ্যিক মহলে ব্যপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্যবস্থা গ্রহণের কড়া বার্তা ও পরিপত্রের ব্যাপ্তি
এনবিআরের জারি করা এই নয়া নির্দেশনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থেকে প্রতিটি স্ক্র্যাপের চালান কঠোরভাবে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইন অমান্যকারী যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্য কাস্টমস অ্যাক্ট অনুযায়ী সর্বোচ্চ জরিমানা, চালান বাজেয়াপ্তকরণ এবং আমদানিকারক নিবন্ধনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট সংকেত দেওয়া হয়েছে।
যাতে এই নির্দেশনার ব্যাপারে দেশের ব্যবসায়ী মহল সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন এবং কোনো প্রকার ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ না থাকে, সেজন্য পরিপত্রটির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- দেশের সকল সরকারি দপ্তর ও কাস্টমস হাউসগুলো
- সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (C&F Agent Associations)
- ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই (FBCCI)
- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA)
- ইস্পাত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য ধাতব খাতের বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় ব্যবসায়ী সমিতি।
সরকার মনে করছে, এনবিআরের এই কঠোর অবস্থান দেশীয় ইস্পাত শিল্পে সৎ ও নিয়মতান্ত্রিক কাঁচামাল আমদানিতে স্বচ্ছতা আনবে, রাজস্ব ফাঁকি রোধ করবে এবং আইনের সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির দুয়ার চিরতরে বন্ধ করবে।
