মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও লজিস্টিক সংকট : ঢাকা কাস্টমসে রাজস্ব ঘাটতি

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

অব্যাহত মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, কার্গো শেডে বারবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ঢাকা কাস্টমস হাউজে দেখা দিয়েছে রাজস্ব মন্দা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামরিক উত্তেজনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের লজিস্টিক সংকটের দ্বিমুখী প্রভাবে বিদায়ী অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে চরম স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় পিছিয়ে পড়েছে বিশাল ব্যবধানে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা কাস্টমস হাউজের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বাটজা) নেতৃবৃন্দের এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে বিস্তারিত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন ঢাকা কাস্টমস হাউজের কমিশনার মোহা. মসিউর রহমান।

কমিশনার জানান, বিদায়ী অর্থবছরে ঢাকা কাস্টমস হাউজের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। যেখানে মূল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায়ের হার অন্তত ৬ শতাংশ কম। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনে বৈশ্বিক মন্দা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলা যুদ্ধের ফলে এভিয়েশন খাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আকাশপথে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় ও শিপিং চার্জ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কাস্টমস শুল্কায়নে।

কেবল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিই নয়, কাস্টমস হাউজের অভ্যন্তরে একের পর এক কার্গো অগ্নিকাণ্ড রাজস্ব শ্লথগতির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে পণ্য পরীক্ষা ও দ্রুত খালাসের জন্য অত্যাবশ্যকীয় স্ক্যানারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আধুনিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে বর্তমানে পণ্য খালাস এবং শুল্কায়ন কার্যক্রমে চরম ধীরগতি ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। কার্গো ব্যবস্থাপনায় এই লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে কার্যক্রমের সার্বিক গতি বাড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা অনাদায়ী রাজস্বের কারণেও ঢাকার কাস্টমস রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে টান পড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কাছে ঢাকা কাস্টমসের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা। এই বকেয়া অর্থ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় সার্বিক রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এসব সংকট ও চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করতে চলতি অর্থবছরে একাধিক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মোহা. মসিউর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, কাস্টমসের সার্বিক কাজ পর্যবেক্ষণ ও গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপন এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগও জোরদার করা হচ্ছে। কমিশনার আশা প্রকাশ করেন, এই অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে আগামী দিনে কাস্টমসের পরিচালন ব্যবস্থা অনেক বেশি দ্রুত ও গতিশীল হবে।

একই সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কাস্টমস প্রশাসনের জিরো টলারেন্স বা কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন কমিশনার। কাস্টমস হাউজের আওতাধীন এলাকায় পণ্য লিকেজ, অসাধু উপায়ে চুরি কিংবা যেকোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকির অপচেষ্টা চালানো হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি স্পষ্ট জানান, অনিয়মের সাথে যুক্ত যে কাউকেই আইনের আওতায় আনা হবে। রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন ঢাকা কাস্টমস হাউজের প্রধান ও মৌলিক লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *