আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ব্যস্ততম বন্দরের তালিকায় ৬৮তম চট্টগ্রাম

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরের আন্তর্জাতিক তালিকায় টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ৬৮তম স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। সদ্য প্রকাশিত লন্ডনভিত্তিক বিশ্বখ্যাত জাহাজ চলাচল ও বন্দরবিষয়ক সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ওয়ান হান্ড্রেড পোর্টস ২০২৬’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি মূলত বিগত ২০২৫ সালের বিশ্বব্যাপী কনটেইনার হ্যান্ডলিং বা পরিবহনের পরিসংখ্যান ও পরিমাণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

লয়েডস লিস্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহনের সার্বিক চিত্রে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ পঞ্জিকাবছরে এই বন্দর দিয়ে রেকর্ড ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউস (টুয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে হ্যান্ডলিংয়ের এই পরিমাণ ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউস। সেই হিসাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ, যা সমপরিমাণে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউস বেশি।

র‍্যাঙ্কিংয়ের পরিসংখ্যানগত ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এর আগে লয়েডস লিস্টের ২০২৫ সালের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর তার আগের অবস্থান (৬৭তম) থেকে এক ধাপ পিছিয়ে ৬৮তম স্থানে নেমে এসেছিল। এবার পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্য বন্দরগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রবৃদ্ধির হারের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং ৬৮তম স্থানেই তা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

বিশ্বের শীর্ষ ব্যস্ততম বন্দরের তালিকার শীর্ষ স্থানটি বরাবরের মতোই নিজেদের দখলে রেখেছে চীনের সাংহাই বন্দর। ২০২৫ সালে রেকর্ড ৫ কোটি ৫০ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টিইইউস কনটেইনার পরিবহন করে একক বন্দর হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিজেদের একচ্ছত্র প্রাধান্য বজায় রেখেছে এটি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য ট্রানজিটের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানটি অর্জন করে নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যের হাব সিঙ্গাপুর বন্দর।

বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বন্দর পরিচালনায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। সৌদি আরবভিত্তিক বিশ্বখ্যাত টার্মিনাল অপারেটর ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল’ (RSGT) চট্টগ্রামের নবনির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (PCT) সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া, ডেনমার্কের বিখ্যাত শিপিং ও টার্মিনাল জায়ান্ট ‘এপিএম টার্মিনালস’ পতেঙ্গার লালদিয়া এলাকায় একটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছে এবং শিগগিরই এর নির্মাণকাজ শুরু করতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই বিদেশি বিনিয়োগ ও বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটরদের আগমন বন্দরের কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তবে শিপিং খাত বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, লয়েডস লিস্টের প্রকাশিত এই সূচকটি মূলত কোনো বন্দরে বছরে মোট কতসংখ্যক কনটেইনার পরিবাহিত হলো (ভলিউম) তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। ফলে এই তালিকা থেকে কোনো বন্দরের জাহাজের অবস্থানকাল (টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম), কাস্টমস ও শুল্ক খালাসের গতি, অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস সাপোর্ট বা সার্বিক পরিচালন দক্ষতার (অপারেশনাল এফিসিয়েন্সি) সম্পূর্ণ কিংবা প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে যদি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে দ্রুত পণ্য খালাসের আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও অটোমেশন জোরদার করা যায়, তবে আগামী বছরগুলোতে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মর্যাদার এই সূচকেও বন্দরটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন ব্যবসায়ীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *