গ্যাস সংকটে পোশাক উৎপাদন ৩০-৪০% কমেছে: বিজিএমইএ

অর্থনীতি স্লাইড

 

গ্যাস সংকটের কারণে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, চলমান গ্যাস সংকট পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল, যা চাহিদার তুলনায় কম। চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর। ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কমে যায়। গ্যাস সংকটে পোশাক শিল্পে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ প্রধান বলেন, আর্থিক ক্ষতি তো হচ্ছেই; তবে তার চেয়েও বড় উদ্বেগ হল—আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা যেন ক্ষুণ্ন না হয়। এ কারণে বাংলাদেশে কার্যরত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন বায়ার্স ফোরামের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জানানো, তাদের প্রত্যাশা বোঝা এবং কীভাবে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে, ৮ বা ৯ আগস্ট থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। দেখা যাক কী হয়?

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয় কিছুটা কমেছে। তবে এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই তুলে ধরে মাহমুদ হাসান বলেন, চলতি বছরের জুলাইয়ের রপ্তানি তুলনা করা হচ্ছে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের সঙ্গে। গত বছরের জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানিতে অনেক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সেখান থেকে এই জুলাইয়ে ২ শতাংশের মতো কমেছে। এটা নিয়ে আমরা বিচলিত নই। তিনি বলেন, এই জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এটিকে ১২ মাসের হিসাবে বিবেচনা করলে বার্ষিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের বেশি হতে পারে। তবে পুরো বছর এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হয় না। কারণ জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

মাহমুদ হাসান বলেন, পোশাক খাতে গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্পে নিয়মিত কিছু কারখানা বন্ধ হয়, আবার নতুন কারখানাও চালু হয়—এটি একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। তবে শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থান বাড়ছে নাকি কমছে। তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি, দেশের নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দক্ষতার ঘাটতি এবং ব্যাংকগুলোর হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন—সব মিলিয়েই কিছু কারখানা সংকটে পড়েছে।

মাহমুদ হাসান বলেন, আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানি করে ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে চাই। তবে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, অন্তত ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই। এ লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী স্পিনিং ও টেক্সটাইল খাত গড়ে তোলা অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি। বিজিএমইএর এই নেতা বলেন, একটি শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলতে স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে টেক্সটাইল খাতের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে বিজিএমইএ। তিনি বলেন, টেক্সটাইল খাতের সহায়তা ছাড়া ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। দুই সংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকতে পারে। কারণ দুটি ভিন্ন সংগঠন। তবে এসব মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল মেশিনারি এক্সিবিশন (বিটমা)’ আয়োজন উপলক্ষে বস্ত্র শিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ ও বিজিএমইএর মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয় সেই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চলতি বছরের ডিসেম্বরে অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল মেশিনারি এক্সিবিশন (বিটমা)’ প্রদর্শনী আয়োজন করা হবে। বিজিএমইএ ও বিটিএমএর যৌথ উদ্যোগের আয়োজিত এই প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য হলো—বাংলাদেশের ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ করা। অনুষ্ঠানে নিজ নিজ সংগঠনের পক্ষে এমওইউতে সই করেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ও বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *