বন্যা ও পাহাড় ধসে ৪৪ প্রাণহানি, সাত জেলায় বিপর্যস্ত ১০ লাখ মানুষ

দেশজুড়ে বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

 

প্রকৃতি যেন তার রুদ্ররূপ ধারণ করেছে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। গত কয়েকদিনের অবিরাম ও রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাত, আর সেই সাথে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের মরণকামড়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। দেশের সাতটি জেলায় বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৪ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্লাবিত হয়েছে মাইলের পর মাইল লোকালয়, যার ফলে সাতটি জেলার অন্তত ১০ লাখ ২২ হাজার মানুষ এখন চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।

শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই বুকভাঙ্গা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।

মৃত্যুর মিছিলে শীর্ষে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম

সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড় ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড় ধসের নিচে চাপা পড়ে এবং বন্যার তোড়ে ভেসে গিয়ে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা হলেও বাকি ১৩ জনই উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী। পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ পাদদেশে বসবাসের কারণেই এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও দেয়াল ধসে আরও ১১ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। নগরীর অনেক নিচু এলাকা এবং জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে। এছাড়া পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে রাক্ষুসে পাহাড় ধস। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারেও বন্যার পানিতে ডুবে ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।

পানিবন্দি লাখো পরিবার: বিপর্যস্ত জনজীবন

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের সাতটি জেলা— খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এই জেলাগুলোর মোট ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ সরাসরি এই দুর্যোগের শিকার হয়েছেন।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দারা। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে এই এক জেলাতেই ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঘরের ভেতর বুক সমান পানি, রান্নার অনুপযোগী পরিবেশ আর বিশুদ্ধ পানির অভাবে জেলার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে দিনাতিপাত করছেন।

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছেন। সেখানকার ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় সাহায্যের অপেক্ষায় আছেন।

জেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির একনজর চিত্র:

  • চট্টগ্রাম: ৭,৫৯,৫৩০ জন ক্ষতিগ্রস্ত (১,৮৮,৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি)
  • কক্সবাজার: ১,৫৮,০২৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত (৩৯,৫০৬টি পরিবার পানিবন্দি)
  • মৌলভীবাজার: ৩৮,১৭২ জন ক্ষতিগ্রস্ত (৪টি উপজেলা প্লাবিত)
  • হবিগঞ্জ: ২৮,১৪০ জন ক্ষতিগ্রস্ত (৩টি উপজেলা প্লাবিত)
  • খাগড়াছড়ি: ২৭,২২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত (৯টি উপজেলা আক্রান্ত)
  • বান্দরবান: ৮,৩৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত (৭টি উপজেলা আক্রান্ত)
  • রাঙামাটি: ৩,৫২৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত (৯টি উপজেলা আক্রান্ত)

অবরুদ্ধ ৫৮ উপজেলা, তলিয়ে গেছে ফসলি জমি

পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় এই সাতটি জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, হাটবাজার, এবং হাজার হাজার একর ফসলি জমি এখন পানির নিচে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সবমিলিয়ে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার বর্তমানে অবরুদ্ধ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে।

সরকারি তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সেখ ফরিদ আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন:

“বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মাঠ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এনজিওকর্মীদের সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে দ্রুততার সাথে শুকনো খাবার, চাল ও নগদ অর্থ পৌঁছানোর কাজ চলছে। দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে।”

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি এবং বন্যার পানির উচ্চতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *