চলতি বছর ও আগামী সময়ের মধ্যে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের নির্বাচনী কার্যক্রমের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪ হাজার ৬৫৩টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজনের বিষয়টি এখন মূলত নির্ভর করছে রাজনৈতিক ও আইনগত সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে দলীয় প্রতীক থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সংসদে। সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে নির্বাচন কমিশন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যদি দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করা হয়, তাহলে সহিংসতা কমবে এবং সরকারের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
স্থানীয় সরকারে নেতৃত্ব সংকট
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত পরিষদ ভেঙে দেয়। এর মধ্যে ছিল সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভা। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব বাতিল হওয়ায় বর্তমানে অনেক জায়গায় প্রশাসনিকভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া না হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক চেয়ারম্যান আত্মগোপনে চলে যান। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনেক চেয়ারম্যান নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় না থাকায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান কার্যত নির্বাচিত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি এবং সেবাপ্রদানে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাই দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
কতগুলো প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন সম্ভব
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে এ বছর ৩ হাজার ৭৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। এছাড়া আগামী বছর আরও ৩৪৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন উপযোগী হবে।
এর পাশাপাশি আগে ভেঙে দেওয়া বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
৩৩০টি পৌরসভা
৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ
১২টি সিটি করপোরেশন
৬১টি জেলা পরিষদ
সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৫৩টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নতুন করে ভোট আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনগত বাধা না থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এসব নির্বাচনের আয়োজন করা সম্ভব। নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, কমিশন সব ধরনের আইন, বিধি এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি বলেন, “কমিশন বিচার-বিবেচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট সব আইনকানুনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবে। প্রয়োজন হলে অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা সব নির্বাচন আয়োজন করতে পারব। সে সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।”
তার মতে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দলীয় প্রতীক থাকবে কি না
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে ইতোমধ্যে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংসদের ওপর।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মতে, সংসদে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে কি না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করলে নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, দলীয় প্রতীক ব্যবহার করলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
তার ভাষায়, “দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বড় দলগুলোর মধ্যে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হলে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ হয়।”
তিনি আরও বলেন, দলীয় প্রতীকের বাইরে নির্বাচন হলে স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক সেবা প্রদানে রাজনৈতিক প্রভাব কম পড়তে পারে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার মূলত জনগণের সেবা প্রদানের প্রতিষ্ঠান। তাই এখানে নির্দলীয় পরিবেশ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, “নির্দলীয় নির্বাচন হলে সাধারণ মানুষ সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পায়। তখন কোনো নির্দিষ্ট দলের সমর্থক হওয়া বা না হওয়ার কারণে বৈষম্যের সম্ভাবনা কমে যায়।”
তিনি আরও বলেন, নির্দলীয় নির্বাচন হলে সেবার মান বজায় রাখা এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের সুযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলে অনেক যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। দলীয় মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা না থাকায় স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
এতে করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা বাড়ে বলেও মনে করেন তারা।
সামনে কী হতে পারে
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বর্তমানে বড় ধরনের নির্বাচনী প্রস্তুতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সংসদের সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ঘোষণা এলে চলতি বছর এবং আগামী বছরের মধ্যেই দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
এতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বশূন্য থাকা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
