এনবিআরে দ্রুত আলাদা হচ্ছে নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ: চেয়ারম্যান

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এক যুগান্তকারী প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আহসান হাবীব। তিনি জানিয়েছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনতে এনবিআর ভেঙে নীতি (পলিসি) এবং বাস্তবায়ন (ইমপ্লিমেন্টেশন) নামে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগ গঠনের প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর এনবিআর মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত ৪৫তম বিসিএস (কর) ক্যাডার কর্মকর্তাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ সংস্কারের কথা জানান। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ট্যাক্সসেশন) অ্যাসোসিয়েশন এই বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এনবিআরের বিদ্যমান রূপরেখা পুরোপুরি বদলে ফেলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং পেপারলেস এনবিআরের স্বপ্ন দেখছি। যে রাজস্ব বোর্ডে ২৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে দেশের প্রায় ৫০ লাখ করদাতার কোনো ধরনের সরাসরি যোগাযোগ বা অনিয়মের সুযোগ থাকবে না। এটি কেবল আমাদের স্বপ্ন নয়; আমরা সরকার ও দেশের সাধারণ জনগণের কাছে এই অঙ্গীকার করেছি এবং আমরা তা বাস্তবে রূপ দেব ইনশাআল্লাহ।”

আয়কর ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক অনলাইন রিটার্ন পদ্ধতির সফলতার কথা তুলে ধরে তিনি এক করদাতার অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। এনবিআর প্রধান বলেন, “আমি নিজে অনেক করদাতার সাথে সরাসরি কথা বলেছি। তাদের কাছে জানতে চেয়েছি এবছর কত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে? তারা হাসিমুখে জানিয়েছেন, বাসায় বসে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ায় তাদের এক পয়সাও অনিয়ম করতে হয়নি। এটাই সিস্টেমের শক্তি।”

তিনি জানান, গত বছর ৪-৯ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৫২ থেকে ৫৩ লাখ করদাতা সম্পূর্ণ অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করবেন। এনবিআর চেয়ারম্যান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, কর্মকর্তা ও সিস্টেমের এই যুগান্তকারী পরিবর্তন দেশকে দেখিয়ে দিয়েছে যে সততা ও স্বচ্ছতার দিক থেকে আয়কর বিভাগ আজ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। করদাতারা যাতে অডিটের নামে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সংস্থার দীর্ঘমেয়াদী অটোমেশন পরিকল্পনা উন্মোচন করে এনবিআর প্রধান আরও স্পষ্ট করেন যে, আগামী ২০২৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এনবিআরে ‘এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন’ বা পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়িত হবে। এর ফলে আয়কর কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ কোনো ‘হিউম্যান টাচ’ বা হ্যান্ডশেকিং থাকবে না।

করদাতারা ঘরে বসেই সব সুবিধা পাবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “করদাতারা নিজ ঘরে বসেই ই-টিন গ্রহণ করবেন, রিটার্ন সাবমিট করবেন এবং সাথে সাথে প্রপ্তি স্বীকারপত্র পেয়ে যাবেন। এমনকি অডিট নির্বাচন এবং রিফান্ড দেয়ার প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। সেখানে কর্মকর্তাদের ম্যানুয়াল কোনো হাত দেয়ার সুযোগ থাকবে না। কর কর্মকর্তারা নিজস্ব কার্যালয় বা ঘরে বসে কেবল পুরো রাজস্ব প্রক্রিয়া মনিটর করবেন এবং রাজস্ব আদায়ে নজর রাখবেন।”

দেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দুর্বল রাজস্ব কাঠামোর কারণে বিদেশিদের সাথে নিয়মিত আলোচনা করতে হচ্ছে, তবে তা কোনো অনুদানের জন্য নয়—বরং অটোমেশন ও কাঠামো শক্তিশালী করার স্বার্থে। রাজস্বের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অক্টোবর মাসে ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা শিগগিরই ৩০ শতাংশে রূপ নেবে। বর্তমানে আয়করে সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং কাস্টমসে ১৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে—যা বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভ্যাট রিটার্নের সময়সীমা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি জানান, রাজস্বের সাময়িক ঘাটতি কাটিয়ে উঠে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি খুব দ্রুত দ্বি অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিটে) পৌঁছাবে।

অনুষ্ঠানে নবীন ক্যাডার কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (ট্যাক্সসেশন) অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও কর কমিশনার সৈয়দ মহিদুল হাসান বলেন, “রাজস্ব বিভাগের প্রতিটি পদক্ষেপ দেশের সার্বিক জিডিপি ও জাতীয় প্রবৃদ্ধির সাথে সরাসরি যুক্ত। আপনারাই সরকারের উন্নয়ন মূলক কাজের অর্থের সঞ্চার করেন। তাই একদিকে যেমন কঠোরভাবে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি করদাতাদের ন্যায্য অধিকার ও সেবা নিশ্চিত করতে সংযম ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে।”

সংগঠনের সহ-সভাপতি ও কর কমিশনার কবীর উদ্দিন মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ৪৪তম বিসিএস (কর) ব্যাচের কর্মকর্তারা ৪৫তম বিসিএস (কর) ব্যাচের নবীন কর্মকর্তাদের ফুল ও শুভেচ্ছা স্মারক দিয়ে বরণ করে নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *