বাংলাদেশে গত সাড়ে ১৩ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৪৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৪৬ হাজার ৩৫১ জন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র, যেখানে দেখা যায় যে কেবল প্রতিপক্ষের ওপর হামলা নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দলও দেশের এই ক্রমাগত প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঘটে যাওয়া মোট ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সংঘাতের তথ্য সংকলন ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য এবং জাতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সংস্থাটি।
টিআইবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাড়ে ১৩ বছরে সংঘাতের ধরন ছিল মূলত দ্বিমুখী—একদিকে প্রধান দলগুলোর মধ্যকার সরাসরি সংঘর্ষ, অন্যদিকে দলের নিজস্ব পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তার কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
- দলগত মুখোমুখি সংঘর্ষ: ২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪২৮টি। এসব আন্তঃদলীয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংহিসতায় নিহত হয়েছেন ৪২৮ জন এবং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন ২৭ হাজার ৮৬০ জন।
- অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও কোন্দল: একই সময়ে দলগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আধিপত্য ও কোন্দল থেকে ১ হাজার ৯২৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পদ-পদবির দৌড় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১৮ জন নেতাকর্মী বা সমর্থক, আর আহত হয়েছেন ১৮ হাজার ৪৯১ জন।
- চলতি বছরের চিত্র (২০২৬): কেবল ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই দেশের রাজনীতিতে ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন ৩ হাজার ৫৯ জন।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা ও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার পেছনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। প্রতিবেদনে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী বলয়ের প্রভাবশালী দলগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্টতায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি এবং নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদেরও বিভিন্ন সহিংস ঘটনার সাথে যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। টিআইবি উল্লেখ করে যে, দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকা এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা নিচুতলার নেতাকর্মীদের মধ্যেও আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মারাত্মক ঘাটতির কথা তুলে ধরেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার অগণতান্ত্রিক চর্চা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই এই সহিংসতা বছরের পর বছর স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ক্ষমতার অপব্যবহার একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ভেতরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সংঘাত, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রক্তক্ষয়ী সহিংসতার এই ধারা কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
