জাপানি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

জাতীয় স্লাইড

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর এক দ্বি-পাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অফিসিয়াল ফেসবুক বার্তায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি খাত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে একাধিক বড় সুসংবাদের কথা নিশ্চিত করেন।

শীর্ষ বৈঠকে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে জাপানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করতে পারে বলে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সুবিশাল এই বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে সরাসরি প্রায় ২ লাখ তরুণ ও নতুন কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও জাপানের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বহুবিধ দ্বি-পাক্ষিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও মজবুত ও কার্যকর রূপ দেন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বাংলাদেশের আপামর জনগণের জন্য দৃশ্যমান সুযোগ ও সুফলে রূপান্তর করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

জ্বালানি খাতে বিশেষ সহায়তা ও টেক পার্কের প্রস্তাব

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে টেকসই ও সুরক্ষিত করার অংশ হিসেবে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় ৫০ হাজার কোটি ইয়েন (প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার) জরুরি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় অগ্রাধিকার পেয়েছে।

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বৈপ্লবিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এই বিশেষ প্রযুক্তি অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকরণের মতো আধুনিক খাতগুলোতে বড় আকারের যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। একই সাথে মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং দেশের বড় ৬টি বিভাগীয় শহরের মধ্যে দ্রুতগামী হাই-স্পিড রেল সংযোগ স্থাপনে জাপানের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প বলয় (বিগ-বি) ও বাণিজ্য চুক্তি

দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ত্বরান্বিত করতে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডিয়াষ্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে যৌথভাবে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দুই দেশের সরকার প্রধান একমত পোষণ করেছেন। এই বলয়ের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দর, কৌশলগত সংযোগ ও শিল্প পরিকাঠামোর বিকাশ ঘটানো হবে, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA) দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কৌশলগত দিকগুলো তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়ে কথা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি

মিয়ানমার থেকে আগত লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের ধারাবাহিক মানবিক সহায়তার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ জানান, যাতে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জন্মভূমিতে সসম্মানে ও নিরাপদে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে টোকিও তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব অব্যাহত রাখে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ সরকার এখন অবকাঠামো, উদ্ভাবন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এক শক্তিশালী অর্থনীতি গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ। উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও দেশটির জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় যৌথ সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *