পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের আরেকটি চালান, ২০ নভেম্বর জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের পরমাণু বিদ্যুৎ

জাতীয় স্লাইড

দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ২০ নভেম্বর থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে। এ কেন্দ্র থেকে প্রাথমিক ধাপে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে, যা টানা চার দিন পরীক্ষামূলকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সিস্টেমের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে উৎপাদন। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত সময়সূচি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রোসাটম।

এদিকে কেন্দ্রটি চালু হওয়া এবং নতুন চালানের বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, রোসাটম থেকে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎ চালুর বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ‘বি-২’ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সমাবত পরীক্ষা ও কারিগরি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই কেন্দ্রটি ‘সি স্টেজ’ বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক ধাপে পদার্পণ করবে। তবে বিদ্যুৎ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় গ্রিডে না দেওয়া পর্যন্ত আরও কিছু কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে একাধিক আন্তর্জাতিক রূপরেখা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী এর প্রথম ইউনিট ২০২২ সালে চালু হওয়ার কথা থাকলেও বৈশ্বিক করোনা মহামারি, পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং কারিগরি কিছু জটিলতায় তা পিছিয়ে ২০২৫ সালের জুনে নির্ধারণ করা হয়। সম্প্রতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোসাটমের প্রথম উপ-মহাপরিচালক ও প্রেসিডেন্ট পেত্রোভ আন্দ্রেইয়ের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে গত ২২ অক্টোবর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সাথে বৈঠক করে তারা আগামী এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও অগ্রগতি প্রতিবেদন রূপরেখা উপস্থাপন করেন।

উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ কেনার মূল দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিক তারিখ বা ক্রয় চুক্তি সম্পর্কিত চূড়ান্ত নির্দেশনা এখনও তারা পাননি। তবে প্রয়োজনীয় সকল ছাড়পত্র পাওয়া গেলে শিগগিরই পিডিবির সাথে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি (PPA) স্বাক্ষরিত হতে পারে।

রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের চূড়ান্ত দাম কত হবে, তা নিয়ে বর্তমানে পর্যালোচনা চলছে। পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটির তৈরি হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রটির উৎপাদন মেয়াদ বা আয়ুষ্কাল ৬০ বছর ধরে এবং মূল বিনিয়োগের খরচ হিসাব করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ৭ মার্কিন সেন্ট বা ৮ টাকা ৭৫ পয়সা হতে পারে। এক্ষেত্রে তারা কোনো ধরনের ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার পক্ষে নয়। তবে কেন্দ্রটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটম এর আয়ু ৮০ বছর ধরার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, পিডিবির প্রাক্কলনে বিমাসহ (Insurance) একাধিক আনুষঙ্গিক পরিচালন ব্যয় যুক্ত করা হয়নি। এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিদ্যুতের প্রকৃত দাম ১০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই মেগা প্রকল্পে রাশিয়ার দেওয়া ঋণ ৪ শতাংশ সুদে ২০ বছরে পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের সার্বিক উৎপাদন দক্ষতা ধরা হয়েছে ৯০ শতাংশ এবং এর বাৎসরিক পরিচালন ব্যয় হবে প্রায় ২০ কোটি ডলার। ফলে ঋণ পরিশোধের ২০ বছর পর এ কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূলে (আনুমানিক প্রতি ইউনিট ৩ সেন্ট) বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে। প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী দেশ ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ যেখানে ২.৫০ থেকে ৪.৫০ রুপি, সেখানে বাংলাদেশে বিনিময় হার ও ডলারের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক খরচ কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের বিদ্যুৎ খাতে ভারসাম্য আনবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রস্তুতির মধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়ান পারমাণবিক জ্বালানির (ইউরেনিয়াম) আরও একটি নতুন চালান দেশে পৌঁছেছে। সোমবার সকালে রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে ১২টি টিপিএসে ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি ভারতের দিল্লি হয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরবর্তীতে বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। এরপর মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৮টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জ্বালানিবাহী বিশেষ গাড়ি বহর ঈশ্বরদীর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। এর মাধ্যমে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটকেও দ্রুততম সময়ে উৎপাদনে আনার প্রক্রিয়া নতুন গতি পেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *